সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা, হরমুজ প্রণালীতে নৌপথের অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস সঙ্কটে দেশীয় কারখানাগুলোতে ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী কৃষি মৌসুমে সম্ভাব্য সঙ্কট এড়াতে রাশিয়া থেকে জরুরি ভিত্তিতে তিন লাখ টন ইউরিয়া আমদানির উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। রুশ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত সার সরবরাহের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ট্রেডিং কোম্পানিকে। একটি কাতারভিত্তিক; অন্যটি সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।
উল্লিখিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (ডিপিএম) মাধ্যমে শুরু করা এই প্রক্রিয়ায় ট্রেডিং কোম্পানির যোগ্যতা, বাড়তি ব্যয় ও স্বচ্ছতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, তা উদ্বেগজনক। এই উদ্বেগ  অমূলক নয়। কারণ মধ্যস্থতাকারী একটি প্রতিষ্ঠান আগের চুক্তির জামানত দিতে ব্যর্থ হয়। শুধু তাই নয়, ওই কোম্পানি পরে বাড়তি দাম দাবি করে। 
প্রস্তাবিত দুই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং বন্দোবস্ত, বাড়তি জাহাজভাড়া বিবেচনায় মধ্যস্থতাকারী ট্রেডিং কোম্পানির ওপর নির্ভরতায় একাধিক ঝুঁকি সামনে এসেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় প্রস্তাবদাতা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সার আমদানির সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খোদ বিসিআইসি নিজে।
তিন লাখ টনের মধ্যে প্রথম প্রস্তাবটির (দুই লাখ টন) প্রক্রিয়াকরণ তুলনামূলক নিয়মমাফিক হয়েছে। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি (এক লাখ টন) ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দুবাই-ভিত্তিক যে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানটিকে দায়িত্ব দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে, এর আগে সরকারি অনুমোদন পেয়েও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত বা বর্ধিত সময়ে ৫ শতাংশ কার্যসম্পাদন জামানত জমা দিতে ব্যর্থ হয়। চুক্তি ভঙ্গকারী একই প্রতিষ্ঠান এবার নতুন করে আগের অনুমোদিত মূল্যের চেয়ে টন-প্রতি প্রায় ২৯ ডলার বাড়তি দর চেয়েছে। রুশ মূল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও পরিবর্তন করেছে। সেই সাথে জ্বালানি মূল্যের দোহাই দিয়ে স্থানীয় পরিবহন ব্যয় আরো বাড়ানোর শর্ত চাপিয়েছে। প্রথম দফায় ব্যর্থ হওয়া একটি প্রতিষ্ঠানকে কোন যুক্তিতে বা কার স্বার্থে আবার উন্মুক্ত প্রতিযোগিতাহীন প্রক্রিয়ায় বেছে নেয়া হচ্ছে— এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব প্রয়োজন। কারণ ৪০ হাজার টনের চালানে বাড়তি প্রায় সাড়ে ১১ লাখ ডলার অতিরিক্ত খরচ দাবি করা হয়েছে। ফলে আমদানি পুরো করতে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হবে। 
জরুরি সার আমদানিতে বিসিআইসি পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন এবং প্রাক-জাহাজীকরণ পরিদর্শনের মতো কিছু কাগজে-কলমে সুরক্ষামূলক শর্ত রাখলেও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বা নিম্নমানের সার এলে শুধু শর্ত দিয়ে সঙ্কট মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে ভরা মৌসুমে মাঠে সারের ঘাটতি দেখা দিলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য উৎপাদনে।
কৃষকের হাতে যথাসময়ে সার পৌঁছানো যেমন জরুরি; তেমনি রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিসিআইসি ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে ব্যর্থ ট্রেডিং কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতা পুনঃযাচাই করা। প্রয়োজনে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বিকল্প উৎসের সন্ধান করা। আর্থিক বিষয় ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির মাধ্যমে শর্তাবলি কঠোরভাবে পুনঃপর্যালোচনা করা। কোনো অবস্থাতে শর্ত ভঙ্গকারী মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

Advertisement