
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে নতুন করে আলোচনা চলছে। চলতি বছরের ৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল-সংক্রান্ত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রাখেন। এর ফলে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং গণভোটের বিধান আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়। অর্থাৎ এর পরের সব জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে।
এ কারণে ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি এবং এর কাঠামোগত রূপরেখা প্রণয়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপকভিত্তিক জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে সার্বিক রাষ্ট্রসংস্কারের একটি রূপরেখা তৈরি করেছিল। সেটি জুলাই জাতীয় সনদ। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশবাসী সেই সনদ অনুমোদন করেন।
জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে স্পষ্ট প্রস্তাব দেয়া আছে। সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বারবার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলেও এ সম্পর্কিত তার কর্মকাণ্ডে অস্পষ্টতা আছে। কারণ শুরুতেই সরকার সংস্কারের প্রসঙ্গ এড়িয়ে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি জুলাই সনদের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক।
এই মুহূর্তে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, গঠনপ্রক্রিয়া ও রূপরেখা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। বলেছেন, এ বিষয়ে বিশিষ্টজন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, সাবেক ও বর্তমান বিচারক এবং গত ১৭ বছরে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার পরিবারগুলোর সাথে আলোচনা করা হবে। মতামত নেয়া হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ অংশীদার ও শহীদ পরিবারের প্রতিনিধিদেরও। সবশেষে দেশের শীর্ষ সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সাথে পর্যালোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করে পরের বছর সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল তুলতে চায় সরকার।
নির্বাচিত সরকার ও জাতীয় সংসদ বলবৎ থাকতে সাংবিধানিক ইস্যুতে এ ধরনের উদ্যোগ আদৌ প্রয়োজনীয় কি না এমন প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ জাতীয় যেকোনো ইস্যুতে আলোচনা ও সমাধানের একমাত্র ফোরাম এখন জাতীয় সংসদ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ইত্যাদি নিয়ে মুক্ত আলোচনা নয়, জাতীয় সংসদে আলোচনা করাই যুক্তিযুক্ত।
যদি বিষয়টি উন্মুক্ত আলোচনার পর্যায়ে নিয়ে যেতেই হয় তাহলে সেটিও করা উচিত পদ্ধতিগত উপায়ে। অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে কমিশন গঠন করে সব রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সাথে নিবিড় সংলাপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটিই কার্যকর ও সঙ্গত পদ্ধতি। সে পথে এগোলেও জাতীয় সংসদকে উপেক্ষার অভিযোগ ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
সংসদে বিরোধী দলকে আস্থায় নেয়া সরকারি দলের জন্যই জরুরি। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের যোগ দেয়ার বিষয়টিকেও সরকারি দল ভিন্ন ইস্যুতে শর্ত হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, যা দৃষ্টিকটু।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরেছে। এর রূপরেখা নির্ধারণ করতে হবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমেই। ভিন্নপথ অবলম্বন বা ধোঁয়াশা সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ কারোরই কাম্য হতে পারে না।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








