
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অন্যতম শর্ত— ভয়হীন পরিবেশ। প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬’-এর খসড়া জনমনে এবং সাংবাদিকদের মধ্যে যে ভীতির সঞ্চার করেছে, গণতান্ত্রিক সমাজে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। ফ্যাসিবাদী জমানায় প্রণীত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) বা আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার মতো নিপীড়নমূলক আইনের ভয়াল স্মৃতি এখনো নাগরিক মন থেকে মুছে যায়নি। নতুন সাইবার আইনের খসড়াটির কিছু ধারা বাকস্বাধীনতা হরণের সুযোগ রয়েছে।
প্রস্তাবিত খসড়া আইনটির বেশ কিছু বিপজ্জনক দিক ও অস্পষ্টতা চোখে পড়ার মতো। আইনের ধারাগুলোতে ‘অপমান’, ‘ধমক’ বা ‘মানহানি’র মতো বিষয় ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। অথচ কোনো সুস্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। ‘যাচাইবিহীন তথ্য’ প্রকাশের দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা জরিমানার মতো কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। জনসমক্ষে প্রকাশ ছাড়া শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে ডিজিটাল কনটেন্ট ব্লক করার অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে। পরিচালনা পরিষদ থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে বাদ দেয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ‘সরল বিশ্বাসের’ নামে যে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে; তা ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ প্রশস্ত করবে। বিস্ময়কর সংযোজন হলো— ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাইবার অপরাধের বিচারের সুযোগ রাখা। প্রশ্ন হলো, সাইবার ক্রাইম বা হ্যাকিংয়ের মতো জটিল প্রযুক্তিগত বিষয় বিচারের সক্ষমতা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কতটুকু আছে?
ত্রুটিপূর্ণ আইনটি পাস হলে নাগরিকের মতপ্রকাশ ও স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা নেমে আসবে, এটি নিশ্চিত বলা যায়। অস্পষ্ট সংজ্ঞার সুযোগে যে কেউ যে কারো বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করতে পারবেন। পরিণামে সমাজে স্ব-আরোপিত নিষেধাজ্ঞার দমবন্ধ করা পরিবেশ পুনরায় ফিরে আসবে। প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে সাংবাদিককে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার বা অনির্দিষ্টকাল কারাবরণ করতে হতে পারে। এ কারণে সরকার বা প্রভাবশালীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এ ধরনের আইনের মূল নিশানা হয় ভিন্নমতাবলম্বী ও সংবাদমাধ্যম। উপরন্তু, ব্যক্তির অপরাধে পুরো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিলের যে বিধান রাখা হয়েছে, তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল করার শামিল। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সম্পাদকদের তীব্র আপত্তিতে সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি অংশীজনদের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সাংবাদিক, সম্পাদক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ১৫ দিনের মধ্যে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠনের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তা ইতিবাচক। সরকারকে অনুধাবন করতে হবে, প্রকৃত সাইবার অপরাধ দমনে শক্তিশালী আইন প্রয়োজন; তা কোনোভাবে নাগরিকের মুখ বন্ধ করে নয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল অঙ্গীকার ছিল নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা। প্রস্তাবিত খসড়া আইনটি যদি কোনো মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া পাস হয়, তবে সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর ভাষায়— দেশ একটি ‘বৃহৎ কারাগারে’ পরিণত হতে পারে। আমাদের প্রত্যাশা, গঠিত পর্যালোচনা কমিটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। খসড়া আইনের দমনমূলক ধারাগুলো বাদ দিয়ে একটি জনবান্ধব সাইবার নিরাপত্তা আইনের রূপরেখা প্রণয়ন করবে সরকার। সাইবার নিরাপত্তার নামে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের সাথে কোনো ধরনের আপস গ্রহণযোগ্য হবে না।









