সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

খুন করে লাশ গুম করতে খুনিরা নদীতে ফেলে দেয়। নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে হত্যা করে শীতলক্ষ্যায় ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিন দিন পর লাশ ভেসে ওঠায় খুনিচক্র চিহ্নিত হয়। সারা দেশে বিস্তীর্ণ জলাশয় বিশেষ করে নদীতে নিয়মিত লাশ পাওয়ার ঘটনা ঘটলেও ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটি প্রথম তীব্রভাবে সারা দেশে নাড়া দিয়েছিল। ওই মামলায় র‌্যাবের কর্মকর্তাসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। 
কাউকে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেয়ার সহজ সুযোগ এখনো অবারিত। নদীতে নিয়মিত লাশ পাওয়ার ঘটনায় এটি সহজে অনুমেয়। 
দেশের আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর ভেতর থেকে মানুষজনকে হত্যার পর নদীতে ডুবিয়ে দেয়ার একটা অপসংস্কৃতি ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় গড়ে উঠেছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চলমান মামলায় সেই তথ্য-প্রমাণ এখন উঠে আসছে। গুম খুনের কারিগররা ঢাকার আশপাশের নদীতে লাশ ফেলত। কয়েকটি নদী ও কিছু স্পট লাশ গুমে দুষ্কৃতকারীরা বাছাই করেছিল। তখন পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে লাশ ফেলা হতো নদীতে। এরপরও কিছু ক্ষেত্রে লাশ ভেসে উঠত। যেমন— নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের বেলায় এমনটি আমরা দেখেছি। হত্যার পর সাগরের মোহনাতেও লাশ ফেলা হতো। র‌্যাবের কুখ্যাত জিয়াউল আহসান এই নির্মম সংস্কৃতি চালুর হোতা। গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে এসে এখনো কেন এত লাশ নদীতে ভাসছে, এই প্রশ্ন গুরুতরভাবে সামনে এসেছে। একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২০ মাসে নৌপুলিশ নদী থেকে ৯০০টি লাশ উদ্ধার করেছে। এগুলোর মধ্যে ২৬৭ জনের পরিচয় জানা যায়নি। লাশগুলোর একটি বড় অংশ উদ্ধার হয়েছে ঢাকার আশপাশ থেকে। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশালসহ অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোর আশপাশে একইভাবে বেশি লাশ পাওয়া গেলেও সারা দেশের নদীতে কমবেশি লাশ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা ও পুলিশ জানাচ্ছে, খুনিরা অপরাধ গোপন করতে লাশ নদীতে ফেলে দেয়। নদীর পানিতে লাশ দ্রুত পচে খুনের আলামত নষ্ট হয়। পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আদালতে উপস্থাপনের মতো তথ্য এর মাধ্যমে এড়ানো যায়। লাশের বড় একটি অংশের পরিচয় শনাক্ত করা যায় না। এতে অনেক অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে লাশের পরিচয় শনাক্ত হলেও খুনের আলামত উদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই কারণে ঘাতকরা লাশ নদীতে ফেলছে। উদ্বেগের বিষয় হলো— নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হওয়ার কথা থাকলেও কেন আগের মতো নদীতে লাশ মিলছে? জমিজমা নিয়ে বিরোধ, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি— এসব কারণে এখনো একটা শ্রেণী কি বেপরোয়াভাবে গুম-খুনে লিপ্ত?
সংশ্লিষ্ট পত্রিকাটি লাশ উদ্ধারের যে চিত্র দিয়েছে, তাতে দেশের নদীগুলো এখনো যেন অপরাধীদের অভয়ারণ্য। এ ছাড়া সড়কপথ ও রেলপথেও ছিন্নভিন্ন লাশ পাওয়া যাচ্ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সত্যিকার উন্নতি ঘটাতে হলে লাশ গুমের পুরনো সংস্কৃতি বদলাতে হবে। সম্ভাব্য স্পটে নজরদারি বাড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জোরালো উদ্যোগ নিলে খুনিদের শনাক্ত করা সম্ভব। লাশ গুমে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা গেলে নির্মম এই সংস্কৃতির অবসান সম্ভব।