সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা করেছে। তারা প্রতিষ্ঠানটিতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। সেই সাথে নিজেদের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়। ঘটনাটি কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় নয়, খোদ রাজধানীর মিরপুরে ঘটেছে। খবর অনুযায়ী, দুই থেকে আড়াই শ’ মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা চালায়। 
হামলাকারীরা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে আটকে ক্লিনিকের মালামাল লুট করে। একই সাথে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে স্থাপনা ভেঙে ফেলে। এরপর প্রতিষ্ঠানের জায়গায় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়। 
স্পষ্টত এটি কোনো ছোটখাটো সন্ত্রাসী গ্রুপের কাজ নয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মিরপুর শাহআলী থানায় মামলা করা হয়েছে। নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। বলেছেন, প্রতিষ্ঠানের ১০ কাঠা জমি দখলের উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়। তার মানে, জমি নিয়ে আগে থেকে বিরোধ আছে। জায়গাটি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের। তারা এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দেয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের লিখিত সম্মতিতে রাড্ডা সেখানে স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করেছে। জমিটি স্থায়ীভাবে পেতে রাড্ডার পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়েছে। রিটের নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। 
অন্য দিকে সমমনা দোকানদার সমিতির দাবি, ২০০৬ সালে জমিটি তাদের বরাদ্দ দেয় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ২০২১ সালে রেজিস্ট্রি হয়েছে। সে সময় রাড্ডা এমসিএইচকে উচ্ছেদে একাধিকবার চিঠি ইস্যু করা হয়; কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগের প্রভাব কাজে লাগিয়ে রাড্ডা দখল ধরে রাখে। এখন মূল মালিকরা অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে সম্পূর্ণ বৈধভাবে নিজেদের জমি বুঝে নিয়েছে।
মূল মালিকরা সন্ত্রাসী কায়দায় মধ্যরাতে হামলা করে কোনো প্রতিষ্ঠান অথবা বাড়ি দখলে নিতে পারে কি না সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তেমন হলে দেশে আইন-আদালত, পুলিশ বা প্রশাসন সব প্রাসঙ্গিকতার ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা আছে। 
স্থানীয়দের বরাতে একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়, অনেক বছর ধরে তিনটি পৃথক গ্রুপ রাড্ডার জায়গাটি দখলে নেয়ার চেষ্টা করছিল। আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি পরিবার জমিটি তাদের পারিবারিক সম্পত্তি বলে দাবি করছে। চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর পরিবারটি এলাকাছাড়া। এ ছাড়া দোকানদার সমিতির পেছনেও মদদ দিচ্ছে বর্তমান সরকারদলীয় স্থানীয় দু’টি পক্ষ। মামলার আসামি হানিফ মিয়া ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য। এ ছাড়া একটি পক্ষের নেতৃত্বে আছেন সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির এমপি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
এতে পরিষ্কার যে, আইন-আদালত উপেক্ষা করে নিছক ক্ষমতার জোরে পরিকল্পিতভাবে একটি প্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টা হয়েছে। প্রশ্ন হলো— প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী লীগের কারো হলেও রাতের অন্ধকারে গায়ের জোরে দখলে নেয়া যায় কি?  
বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণীর নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, দখলবাজির অভিযোগ আছে। চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর এ নিয়ে গণমাধ্যমে রীতিমতো তোলপাড় হয়। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসার পর সংবাদমাধ্যমে তা থিতিয়ে এলেও মাঠের বাস্তবতা যে আদৌ পাল্টায়নি মিরপুরের ঘটনা তার সবশেষ নজির। এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে জন্য আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে বর্তমান সরকারের সতর্ক হওয়া জরুরি।