
২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতির ৯ বছর কেটে গেলেও একজনকেও নিরাপদে স্বদেশে পাঠানো যায়নি। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন চলাকালে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবিতে সমাবেশ ও মানববন্ধনের আয়োজন করে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা-ইউসিআর। উখিয়ায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা নেতারা জানান, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা তারা পেয়েছেন। কিন্তু তাদের দরকার নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার নিশ্চয়তা। এ জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, সময়ভিত্তিক ও বিশ্বাসযোগ্য পথনকশা তারা জাতিসঙ্ঘের কাছে দাবি করেছেন। এদিকে সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে তার আগের দিন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দাবি জানান বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ে জোরদার প্রয়াস অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আন্তরিকতার সাথে অগ্রসর হতে হবে।
নিউ ইয়র্কে গত বুধবার জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে বৈঠকটির আয়োজন করে। তারেক রহমান বৈঠকে অংশ নিয়ে এ সঙ্কট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। তাতে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে সুস্পষ্ট বিশ্বাসযোগ্য পথনকশা প্রণয়নের প্রস্তাব করেন। প্রক্রিয়াটি দ্রুততার সাথে করার পাশাপাশি মিয়ানমারে টেকসই প্রত্যাবাসনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীদারদের প্রতি প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা করতেও আহ্বান জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন এতে অংশ নেন গাম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট, জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত এবং জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ। রোহিঙ্গাদের বৃহৎ প্রবাহ যখন হয়েছে; তখন ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায়। তারা সঙ্কট সমাধানের চেয়ে এটিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের পথে হেঁটেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী জেনারেলদের বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রেও আন্তরিক ছিল না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে মিয়ানমারের সেনা নেতৃত্ব। এ কারণে জান্তা সরকারকে কখনো রোহিঙ্গা নিয়ে সেভাবে চাপে পড়তে হয়নি। ফলে তারা একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি।
রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তাও এখন কমে এসেছে। বৈঠকে তারেক রহমান মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ২০২৫ সালে যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (জেআরপি) আওতায় ৯৩৪ মিলিয়ন ডলার সাহায্য চাওয়া হয়েছিল। পাওয়া গেছে মাত্র ৪৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, যা চাহিদার ৪৬ শতাংশ। চলতি বছরে সেটি বড়দাগে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা বাড়ছে। তাদের ভরণপোষণে ব্যয়ও বাড়ছে। রোহিঙ্গা জনসংখ্যার কারণে স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবেশ চাপে পড়েছে। বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে লালনপালন দিন দিন দুরূহ হয়ে উঠছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায় আছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক শক্তিগুলো এ দায় এড়াতে পারে না। এ অবস্থায় একটি বহুপক্ষীয় সমঝোতা দরকার। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে মিয়ানমার সেনা নেতৃত্বের বিচার এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে রাখাইনে পরিবেশ তৈরি। দুটো একসাথে করতে পারলে আশা করা যায়, সঙ্কট সমাধানের পথ প্রশস্ত হবে। এ জন্য বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাবিষয়ক কার্যক্রম জোরদার অব্যাহত রাখতে হবে।








