
সারা দেশে অল্পবয়সী বা কিশোররা যেভাবে ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তাতে বিবেকসম্পন্ন কেউ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে পারছেন না। এর সর্বশেষ নৃশংস ঘটনার নজির কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড। ১৩ বছর বয়সী এই কিশোর কয়েক দিন আগে তার সঙ্গীদের হাতে খুন হয়। এ ঘটনা জনপরিসরে সমালোচনার ঝড় তুলেছে। সাথে সাথে কিশোরদের ভয়ঙ্কর আরো সব অপরাধ সামনে আসছে। প্রশ্ন উঠেছে— কিশোর গ্যাং কিভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় তা নিয়ে।
অপ্রতিম হত্যার শিকার হওয়ার পর কুমিল্লাজুড়ে সম্প্রতি পরিচালিত অভিযানে সাড়ে ছয় শতাধিক আটক করা হয়। পরবর্তীতে বেশির ভাগকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এই ছেড়ে দেয়ার ঘটনাটি কিশোর অপরাধ দমনে আমাদের বর্তমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি রূঢ় বাস্তবতা সামনে এনেছে। গণমাধ্যমের খবর— কুমিল্লার টাউন হল-সংলগ্ন দেয়ালে গ্যাংগুলোর নাম লেখা থেকে শুরু করে অনলাইনভিত্তিক ‘ডিবিএক্স’ বা ‘সিবিকে’-এর মতো গ্রুপের প্রকাশ্যে সক্রিয়তা প্রমাণ করে, অনিয়মিত বা হঠাৎ পরিচালিত বড় ধরনের অভিযানের মাধ্যমে এই সামাজিক ব্যাধি দমন করা প্রায় অসম্ভব।
পুলিশ ও গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধ এবং বিগত বছরগুলোতে বেশ কিছু হত্যায় কিশোর গ্যাংয়ের নাম উঠে আসে। অথচ জেলা পুলিশের কাছে সক্রিয় গ্যাংগুলোর কোনো হালনাগাদ তালিকা না থাকা এবং আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্বল এজাহার তৈরির কারণে আইনি পদক্ষেপ প্রায়ই স্থবির হয়ে পড়ছে। লক্ষণীয় যে, অনেক মামলার এজাহারে নির্দিষ্ট অপরাধের বিবরণ ঠিকভাবে উল্লেখ করা থাকে না। পূর্ববর্তী অপরাধের নথিপত্র সঠিকভাবে উপস্থাপন না করায় অপরাধে জড়িতরা সহজে জামিনে বেরিয়ে আসে। জামিনে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই আইনের এই ফাঁকফোকর বন্ধে পুলিশ ও আইনি প্রক্রিয়ার সক্ষমতা বাড়ানো এবং পেশাদার তদন্ত নিশ্চিত করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই সাথে দাউদকান্দি মডেল থানার অনাকাক্সিক্ষত হট্টগোল ও তথ্যের অমিল প্রমাণ করে, ঢালাওভাবে ধরে এনে অভিভাবকদের জিম্মায় ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়াটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া পরিচালিত হলে তা প্রশাসনের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। তাই কিশোর অপরাধীদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র বা সংশোধনমূলক ব্যবস্থার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপসংস্কৃতি রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপে জোর দেয়া দরকার বলে মনে হয়। যেমন— হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা। প্রতিটি থানা এলাকায় সক্রিয় গ্যাং, মূল সমন্বয়ক ও তাদের ব্যবহৃত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের তথ্য সংরক্ষণ ও নজরদারি বাড়ানো। নিবিড় বিট পুলিশিং : নিয়মিত টহল বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করা, যেন বড় অপরাধে জড়িতরা প্রশাসনিক বা আইনের ফাঁক দিয়ে বের হতে না পারে।
কিশোরদের অপরাধ দমনে আইনি সংস্কার ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা না গেলে সাময়িক অভিযানে সুফল মিলবে না। গজিয়ে ওঠা ভয়ঙ্কর কিশোর গ্যাং কালচার উপড়ে ফেলতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রতিরোধমূলক ও টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক উপায় নিতে হবে।








