
শরীরের রক্ত পানি করে খাদ্য ব্যবস্থাপনার চাকা সচল রাখলেও নীলফামারী সদর উপজেলা খাদ্যগুদামের শ্রমিকরা চরম শোষণের শিকার হচ্ছেন। শোষণের মাত্রা এমন যে, সরকার নির্ধারিত মজুরির অর্ধেকের কম পারিশ্রমিক পাচ্ছেন তারা। ৫০ কেজির বস্তা পিঠে বইতে হচ্ছে তাদের। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই কঠোর কায়িক পরিশ্রম তারা করেন। চাল উঠানো-নামানোয় সরকার নির্ধারিত টন-প্রতি ১৩০ টাকার জায়গায় শ্রমিকরা পাচ্ছেন মাত্র ৪৭ টাকা। ধান-গমে ২৫০ টাকার জায়গায় পাচ্ছেন ১০০ টাকা। এমন শ্রম শোষণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
নয়া দিগন্ত বলছে, নীলফামারী সদর উপজেলা খাদ্যগুদামে ধান, চালসহ নানা ধরনের খাদ্যশস্য উঠানো-নামানোর কাজে প্রায় ৭০ জন শ্রমিক নিয়োজিত আছেন। শ্রমিকদের অভিযোগ— ন্যায্য পাওনা চাইলে তাদের কাজ থেকে বাদ দেয়া ও সাময়িক বরখাস্তের হুমকি দেয়া হয়। প্রায় চার বছর ধরে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শ্রমিকদের পারিশ্রমিক পরিশোধে ‘খালেক এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের কাজের মজুরি সম্পর্কে অবহিত করে না। ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পারিশ্রমিক দেয়ার কথা থাকলেও তা পরিশোধ করা হয় নগদ টাকায়। গোলাম রাব্বী নামের এক শ্রমিক বলেন, তাদের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নেয়া হয়। পরে ওই চেক দিয়ে টাকা তোলা হলেও তারা প্রকৃত পাওনার হিসাব জানেন না।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খালেক এন্টারপ্রাইজ দুর্নীতি ও অনিয়ম করছে। ব্যাংক হিসাব খুলে চেকের মাধ্যমে শ্রমিকদের মজুরি দেয়ার কথা। দেখা যায়, তাদেরে কাছ থেকে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নেয়। বাস্তবে নগদে তাদের মজুরি দেয়া হচ্ছে। অর্ধেকের চেয়েও কম মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের ঠকানো হচ্ছে। চার বছর ধরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি এই অন্যায় করছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদাসীন হয়ে আছে।
ন্যায্য পাওনা চাইলে কাজ থেকে বাদ দেয়া বা সাময়িক বরখাস্তের হুমকি এবং শ্রমিক সর্দারের যোগসাজশ প্রমাণ করে, এখানে একটি সঙ্ঘবদ্ধ দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো— জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বজ্ঞানহীন নীরবতা ও অনুপস্থিতি, যা এই অনিয়ম পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দেয়ার শামিল। শ্রমিকদের বঞ্চিত করে ভালো কিছু অর্জন সম্ভব নয়। সরকারি ব্যবস্থায় সুশাসন ও শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন আসে।
নীলফামারী সদর উপজেলা খাদ্যগুদামে নিয়োজিত শ্রমিকদের শ্রমশোষণ বন্ধ করতে হবে। মজুরিবৈষম্য দূর করতে ভুক্তোভোগীদের অভিযোগ আমলে নিতে হবে। শ্রমিক বঞ্চনা অবসানে জেলা প্রশাসন ও খাদ্য অধিদফতরকে যৌথভাবে তদন্ত করতে হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানটির লিজ বাতিলসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সাথে ফাঁকা চেকের জালিয়াতি বন্ধ করে প্রত্যেক শ্রমিকের ডিজিটাল বা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরকার নির্ধারিত পূর্ণ মজুরি প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের ক্ষুধার্ত রেখে এবং তাদের ন্যায্য পাওনা বঞ্চিত করে খাদ্যনিরাপত্তার কথা বলা একধরনের প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।








