শামা ওবায়েদ, কপ-৩১
‘জনবান্ধব জলবায়ু নীতি : কপ-৩১-এ বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে শামা ওবায়েদসহ অন্যরা। নয়া দিগন্ত

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) বাস্তবায়নে আগামী ১০ বছরে ১১৬ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে ৯০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারই আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে সংগ্রহ করতে হবে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় আসন্ন জাতিসঙ্ঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১-এ উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি পূরণ, ঋণমুক্ত ও অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত এবং বাংলাদেশের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর জোরালো করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার ও নাগরিক সমাজ।

Advertisement

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান কমাতে সরকার, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে এ সহায়তা অনুদানভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জনবান্ধব জলবায়ু নীতি : কপ-৩১-এ বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশে জলবায়ু নিয়ে কাজ করা ৩৩টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।

সংলাপে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের হালনাগাদ এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নে ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ১১৬ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে ৯০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে আসার কথা। অন্যদিকে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় ২০২৩ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ১১৩টি উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবেলা, নির্গমন হ্রাস ও অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির এক দশক পেরিয়ে যাওয়ার পর এখন শুধু অঙ্গীকার নয়, বাস্তবায়নের অগ্রগতিও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় অর্থায়ন প্রয়োজন। অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আলোচনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি।

এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। জলবায়ু নিয়ে কাজ করা তরুণদেরও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।

কপ-৩১-এ বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরার পরিকল্পনার কথাও জানান শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিশেষ ‘জুট প্যাভিলিয়নের’ মাধ্যমে এসব পণ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার উদ্যোগ রয়েছে। এতে পাটের বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশীয় কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ঋণের বোঝা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার 
সংলাপে নাগরিক ও সুশীল সমাজের জাতীয় অবস্থানপত্রে জলবায়ু অর্থায়নকে ঋণমুক্ত ও অনুদানভিত্তিক করা, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে অর্থ পৌঁছানো এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে জলবায়ুবিষয়ক নীতিনির্ধারণ এবং জাতীয় প্রতিনিধিদলে অর্থবহভাবে সম্পৃক্ত করার দাবি জানানো হয়।

সমাপনী বক্তব্যে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। তাই আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে ঋণের বোঝা নয়, অনুদানভিত্তিক আর্থিক সহায়তা আদায়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’

স্বাগত বক্তব্যে ন্যাচার কনজার্ভেশন ম্যানেজমেন্টের (ন্যাকম) নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, ‘প্যারিস চুক্তির ১০ বছর পর এর বাস্তবায়ন কতটা এগিয়েছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ নিজস্ব এনডিসি বাস্তবায়নে চেষ্টা চালালেও জলবায়ু অর্থায়ন, নীল অর্থনীতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নগরাঞ্চলে তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সুস্পষ্ট ও সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।’

সংলাপে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী বলেন, ‘শিল্প খাতে নির্গমন কমানোর উদ্যোগ চলছে। আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের দাবিগুলো কার্যকরভাবে তুলে ধরতে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।’

২০৩৫ সালের মধ্যে নির্গমন কমানোর লক্ষ্য
সংলাপে ছয়টি বিশেষ খাতের তথ্য ও উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়। এনডিসি ৩.০ অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ বা ৮৪ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি দেশীয় পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন বলে আলোচনায় উঠে আসে।

জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার আওতায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় ১১৩টি উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নগরাঞ্চলে তাপপ্রবাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।

সংলাপে সেন্টার ফর অ্যাটমসফেরিক পলিউশন স্টাডিজের (সিএপিএস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ ও শিল্প খাতে নির্গমন কমানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের মেহজাবিন মাহফুজ ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর এবং আবরার জিশান ও হেলেনা সামুদ্রিক সম্পদ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা করেন। সিত্রিইআরের রৌফা খানম বৈশ্বিক নির্গমন ও বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর ও তরুণদের অংশগ্রহণ
জলবায়ু মোকাবেলায় শুধু অর্থায়ন সংগ্রহ নয়, সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে এবং কারা এর সুফল পাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন আলোচকরা। শিল্প খাতে নির্গমন কমানোর পাশাপাশি শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের সুপারিশ করা হয়।

তরুণদের পক্ষ থেকে চৌধুরী আবরার জাহিন, সোহাইল বিন সাইফুল্লাহ ও হেলেনা খাতুন জলবায়ু অর্থায়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন।

জাতীয় অবস্থানপত্রে কপ-৩১-এ সরকার, নাগরিক সমাজ, তরুণ ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত অবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাটের মতো পরিবেশবান্ধব দেশীয় পণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরার সুপারিশ করা হয়েছে। একইসাথে জলবায়ু অভিবাসীদের নিরাপদ আবাসন, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নগরাঞ্চলে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

আসন্ন কপ-৩১-এ বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সহায়তায় রূপান্তর করা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা যেন নতুন ঋণের বোঝা তৈরি না করে এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগে, তা নিশ্চিত করতে সরকার ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেয়া হয়েছে সংলাপে।