
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেয়ার পর ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় গেজেটভুক্ত হন বাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী।
এর আগে ২০১১ সালের ২৮ ডিসেম্বর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে তিনি সাক্ষ্য দেন। তার সাক্ষ্য দেয়ার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাকে পুরস্কারস্বরূপ মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত করে—এমন অভিযোগ করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
এদিকে, মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করেছেন পিরোজপুরের দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
গত ২৪ অক্টোবর মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান ও দাফন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এ সময় তাকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে বক্তব্য দিয়েছেন পিরোজপুরের দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন ও মির্জা জহিরুল হক।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেনের দাবি, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার কারণে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পুরস্কার হিসেবে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছিল।
এসময় তিনি আরো দাবি করেন, ১৯৭১ সালে সাঈদী পিরোজপুরে ছিলেন না এবং তিনি রাজাকারও ছিলেন না।
আব্দুস সালাম বাতেন বলেন, ‘মানিক পশারী সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় প্রশাসন তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দিতে বাধ্য হয়েছে।’ মানিক পশারীকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বলে মনে করেন না বলেও জানান তিনি।
আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা মির্জা জহিরুল হক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা হলে মানিক পশারী তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন।’ তার দাবি, এরপর তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে আর যাচাই-বাছাই করা হয়নি।
তিনি আরো বলেন, ‘মানিক পশারী সরকারি গেজেটভুক্ত থাকায় প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেয়ার কথা ছিল।’ এ নিয়ে বাধার সৃষ্টি হয় বলেও জানান তিনি।
অপরদিকে মানিক পশারীর ছোট ভাই চাঁন মিয়া পশারী ও হাসিনা বেগম দাবি করেছেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান।
তার ছোট ভাই চাঁন মিয়া পশারী বলেন, ‘তাকে ও তার বড় ভাই মানিক পশারীকে আর্থিক প্রলোভন দেখানো হয়েছিল।’
তিনি নিজে সেই প্রলোভনে পা না দিলেও তার বড় ভাই অর্থের লোভে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। মিথ্যা সাক্ষ্য দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চাঁন মিয়া পশারী আরো বলেন, ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রাজাকার ছিলেন না। সে সময় সাঈদী অনেক ছোট ছিলেন। রাজাকার ছিলেন রামেশ মোল্লা, মোসলেম মাওলানা ও সেকেন্দার শিকদার।’
চাঁন মিয়া পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় আমার নাম আমার ভাই দেয়নি। কেন নাম দেয়নি, তা সে ভালো বলতে পারবে। আমরা পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে ছোট ভাইও গুলি খেয়েছে। আমার ভাইয়ের যাদের যাদের ভালো লেগেছে, তাদের তাদের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম দিয়েছে। আমার নাম দেয়নি, কারণ আমি সাঈদীর পক্ষে ভালো কথা বলেছি। আমার ভাই আমাকে দুই টাকা দিয়েও কখনো সাহায্য করেনি। আমি সাঈদীর গুণগান করেছি, এ কারণে।’
মানিক পশারীর বোন হাসিনা বেগমের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তার ভাই টাকার বিনিময়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার ভাইকে অনেক অনেক টাকা দিয়েছে। টাকার বন্যা বয়ে গেছে।’
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কি যুদ্ধাপরাধী ছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে হাসিনা বেগম বলেন, ‘আমি কিছু জানি না, আমার ভাই জানে।’
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ‘আল্লাহর ওলি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মানিক পশারীর বোন হেনা পশারী। তবে তার ভাই কেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি।
পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর বাড়িতে সাংবাদিকেরা হেনা পশারীর সাথে কথা বলেন।
এ সময় তার ভাইয়ের সাক্ষ্য দেয়ার প্রসঙ্গ উঠলে তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি খুলনায় শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন। পরে এ বিষয়ে ভাইয়ের সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ হয়নি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে ভাইয়ের কাছে কিছু জানতেও চাননি তারা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








