
‘ইস! একটা বড় সুযোগ ছিল। শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল।’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফরে ব্যবহৃত একটি বাসের ছবি নিয়ে ফেসবুকে প্রকাশিত একটি পোস্টের মন্তব্যের ঘরে এ কথা লেখেন ‘আবু বকর সিদ্দিক’ নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী। পরে ওই মন্তব্য ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে রাজশাহীর কলেজছাত্র আবু বকর সিদ্দিককে (২২) আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় তার বাবা আয়নাল হককেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাবা-ছেলে দুজনই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হেফাজতে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনাটি ঘিরে আবু বকরের পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও নানা বক্তব্য সামনে এসেছে। পরিবারের দাবি, তাকে এ ঘটনায় ফাঁসানো হচ্ছে। অন্যদিকে, স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্যে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ফেসবুক অ্যাকাউন্টটির প্রকৃত ব্যবহারকারী, মন্তব্যের পেছনের উদ্দেশ্য এবং এ ঘটনায় আইনগত দায়ের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুর ২টার দিকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও চন্দ্রিমা থানা পুলিশের একটি দল আবু বকরের বাড়িতে যায়। তখন তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। পরে বিকেল ৪টার দিকে এসআরবি-৫-এর সদস্যরা সাদাপোশাকে সেখানে অভিযান চালান। আবু বকরকে না পেয়ে তার বাবা আয়নাল হককে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
একপর্যায়ে আয়নাল হক জানান, তার ছেলে রাজশাহীর পবা উপজেলার হাটরামচন্দ্রপুর ঘোলহারিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে রয়েছেন। পরে তাকে সাথে নিয়ে সেখানে অভিযান চালানো হয়। ওই বাড়ি থেকে আবু বকরকে আটক করা হয়। এ সময় পরিবারের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এসআরবি-৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়সাল ইশতিয়াক গণমাধ্যমকে জানান, আবু বকর ও তার বাবাকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ও উপপুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ডিএমপি কাজ করছে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী এসআরবি অভিযুক্ত যুবককে আটক করে ডিএমপির কাছে হস্তান্তর করেছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আবু বকরের কোনো রাজনৈতিক দল বা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত ডিএমপির পক্ষ থেকেই জানানো হবে।’
আটকের পর বৃহস্পতিবার সকালে আবু বকরের বাড়িতে তল্লাশি চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, চন্দ্রিমা থানা পুলিশ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চালালেও জব্দ করার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো আলামত পায়নি। শুধু একটি পেনড্রাইভের মোড়ক জব্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ সময় পুলিশ আবু বকরের ব্যবহৃত ল্যাপটপ উদ্ধারের চেষ্টা করে। তবে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, আবু বকর ল্যাপটপ ব্যবহার করতেন না এবং তার কোনো ল্যাপটপ নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, আবু বকর ও তার বাবাকে থানায় হস্তান্তর করা হয়নি।
ওসি মনিরুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, আবু বকর এর আগে গ্রেফতার হয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো তথ্য নেই। তার নামে কোনো মামলা রয়েছে কি না, সে তথ্যও পাওয়া যায়নি। তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সম্পর্কেও নিশ্চিত তথ্য জানা যায়নি।
রাজশাহী মহানগরীর চন্দ্রিমা থানার কেচুয়াতৈল এলাকায় আবু বকরের বাড়ি। তার বাবা আয়নাল হক পেশায় কৃষক। চার ভাইবোনের মধ্যে আবু বকর সবার বড়। তিনি রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
কলেজটির ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, আবু বকর নিয়মিত শিক্ষার্থী এবং প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছেন। তবে পরীক্ষার ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। কলেজে তার মধ্যে খারাপ কিছু দেখেননি বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পড়াশোনার পাশাপাশি আবু বকর ভ্যানে সবজি পরিবহনের কাজ করেন। এলাকায় তিনি পরিশ্রমী ও ভালো ছেলে হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা। বাইকারদের একটি দলের সাথেও তার যোগাযোগ রয়েছে। ওই দলের সদস্যদের সাথে মোটরসাইকেলে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যেতেন তিনি।
আবু বকরের মা আসমাউল হুসনা দাবি করেন, তার ছেলে নিরীহ, পরিশ্রমী ও মেধাবী। তাকে এ ঘটনার সাথে ফাঁসানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আবু বকরের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, ফেসবুকে মন্তব্যের বিষয়টি জানার পর তিনি কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলেছেন। তাদের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, আবু বকরের বাবা আগে আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন এবং ৫ আগস্টের পর জামায়াতের সাথে মিশছেন। আবু বকর পারিবারিক সূত্রে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন বলেও তিনি শুনেছেন। তবে কলেজে আবু বকরের কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তিনি দেখেননি বলে উল্লেখ করেন এই শিক্ষক।
রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মাহমুদ হাসান লিমন জানান, প্রশাসনের লোকজনের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, আবু বকর আগে ছাত্রলীগ করতেন এবং বর্তমানে ছাত্রশিবিরের সাথে যুক্ত বলে আলোচনা রয়েছে। তবে কলেজে তার এমন কোনো কর্মকাণ্ড তিনি দেখেননি। আবু বকরকে তারা ব্যক্তিগতভাবেও খুব একটা চিনতেন না বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজশাহী মহানগর সভাপতি ইমরান নাজির দাবি করেন, আবু বকরের সাথে তাদের সংগঠনের কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই। তার ভাষ্য, কোনো ঘটনা ঘটলেই ছাত্রশিবিরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে আবু বকরের রাজনৈতিক পরিচয় ও কোনো সংগঠনের সাথে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে এসব বক্তব্যের কোনোটিই স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাজশাহী সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিমানবন্দর থেকে মাদরাসা মাঠ, সেখান থেকে ধর্মসভা এবং পরে বিমানবন্দরে যাতায়াতের সময় রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) একটি বাস ব্যবহার করেন। এ সময় সড়কের দুই পাশে জড়ো হওয়া মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও তাদের অভিবাদনের জবাব দেন।
পরে ‘দ্য বিউটি অব রাজশাহী’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রধানমন্ত্রীর বাসে বসে থাকার ছবি প্রকাশ করা হয়। পোস্টটির ক্যাপশনে রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত লাল-সবুজ বুলেটপ্রুফ বাসের পরিবর্তে রুয়েটের বাস ব্যবহারের কারণ জানতে চাওয়া হয়। ওই পোস্টের মন্তব্যের ঘরেই ‘আবু বকর সিদ্দিক’ নামের অ্যাকাউন্ট থেকে বিতর্কিত মন্তব্যটি করা হয়। মন্তব্যটি ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করে অভিযান চালায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি আবু বকরেরই কি না, মন্তব্যটি করার পেছনে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এর সাথে কোনো পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
আবু বকর ও তার বাবাকে ডিবির হেফাজতে নেয়া এবং তার বাড়িতে তল্লাশির ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফেসবুক মন্তব্যটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট, এর পেছনের উদ্দেশ্য এবং আইনগত দায় নির্ধারণে তদন্তের ফলই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








