
সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশী নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হলেও এ তথ্য নাকচ করেছেন নজরুলের পরিবার।
নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির ও মা রহিমা বেগম জানিয়েছেন, সুইটি আক্তারকে তারা চেনেন না। তার ছেলে কখনো বিয়ে করেছেন কি না, সে বিষয়েও পরিবারের জানা নেই।
নজরুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের আব্দুল বাছিরের বড় ছেলে। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কায় গ্রেফতার হন তিনি। একই ঘটনায় সুইটি আক্তার নামে এক বাংলাদেশী তরুণীকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে জানায় স্বজনরা।
আব্দুল বাছির বলেন, ‘আমার ছেলে কখন বিয়ে করেছে, তা আমরা জানি না। সুইটি আক্তার নামে কাউকে আমরা চিনিও না। শুনেছি, তারা একই জায়গায় কাজ করতো। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের স্বামী-স্ত্রী বলে যে প্রচার করা হচ্ছে, তা আমাদের জানা তথ্যের সাথে মেলে না।’
পরিবারের দাবি, নজরুল সৌদি আরবে গ্রেফতার হওয়ার পর তিন বছর তিন মাস কারাগারে ছিলেন। তবে কী কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, সে বিষয়ে পরিবার এখনো বিস্তারিত জানতে পারেনি। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারে নজরুলের পরিবার।
ছেলের মৃত্যুর খবরে শোকাহত আব্দুল বাছির এখন তার লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন। সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তিনি। সেই ঋণের বোঝা এখনো তার কাঁধে। এর মধ্যে ছেলেকে হারানোর শোক পরিবারটির জন্য আরো অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
নজরুলের মা রহিমা বেগম জানান, কারাগারে থাকার সময়ও ছেলে প্রতি রোববার পরিবারের সাথে ফোনে কথা বলতেন। ছেলের ফোনের অপেক্ষায় থাকতেন তিনি। কিন্তু এবার আর ফোন আসেনি। গণমাধ্যমের খবরেই জানতে পারেন ছেলের মৃত্যুর কথা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘জেলে থাকার পরও আমার ছেলে প্রতি রোববার ফোন করে আমাদের সাথে কথা বলতো। ছেলের ফোনের অপেক্ষায় থাকতাম। কিন্তু এবার আর ফোন আসেনি। গণমাধ্যমের খবর দেখে জানতে পারলাম, আমার ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কাউকে কিছু জানানো হলো না, ছেলের সাথে শেষবারের মতো কথা বলার সুযোগও পেলাম না। আমার বুকের ধন আর কোনো দিন মা বলে ডাকবে না—এ কষ্ট আমি কিভাবে সহ্য করব? আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল, কেন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো, তা-ও জানি না। শেষবারের মতো ছেলের মুখটা দেখতে চাই। আমার ছেলের লাশটা দেশে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করুন।’
নজরুলের মৃত্যুর খবর পরিবারটির জন্য আরো একটি শোকাবহ ঘটনা বয়ে আনে। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাতিজার মৃত্যুর খবর শুনে গত ১৪ অক্টোবর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তার ফুফু আবেদা বেগমের (৬৫)। একদিকে ছেলেকে হারানোর শোক, অন্যদিকে পরিবারের সদস্যের মৃত্যু—সব মিলিয়ে বিরামপুরের বাড়িটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুলের আইনি অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সাথে বাংলাদেশ সরকারকে সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য উদঘাটন ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো: আবু সাঈদ জানান, নজরুলের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা বা এবিষয়ে সহায়তার জন্য প্রশাসনের কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি। পরিবারের পক্ষ থেকেও আবেদন করা হয়নি। তবে লাশ দেশে এলে নিয়ম অনুযায়ী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নজরুল ও সুইটির স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ের বিষয়ে পরিবারের বক্তব্য, তারা একই স্থানে কাজ করতেন বলে শুনেছেন; কিন্তু তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল—এমন কোনো তথ্য তাদের জানা নেই। তাই বিষয়টি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রচার না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বিরামপুরের এই পরিবারটির সামনে এখন শোকের পাশাপাশি অনিশ্চয়তার দীর্ঘ পথ। একদিকে সাত লাখ টাকার ঋণ, অন্যদিকে প্রিয় সন্তানের মৃত্যুর যন্ত্রণা। তার ওপর ছেলের লাশ আদৌ দেশে ফিরবে কি না, সেই নিশ্চয়তাও নেই। যে মা প্রতি রোববার ছেলের ফোনের অপেক্ষায় থাকতেন, সেই মায়ের কাছে এখন আর কোনো ফোন আসবে না। যে বাবা পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন, সেই বাবাই আজ ছেলের শেষ চিহ্নটুকু ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায়। তাদের আকুতি—ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা জানানো হোক, আর শেষবারের মতো তার মুখ দেখার সুযোগ করে দেয়া হোক।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








