
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ও এর আশপাশের সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভয়ঙ্কর প্রতারক চক্রের অপতৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছদ্মবেশে ছিনতাই, অপহরণ করে অর্থ আদায়, লুটের মতো বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
এসব ঘটনায় কয়েকটি চক্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের চাকরিচ্যুত কিংবা বরখাস্তকৃত কতিপয় সদস্য রয়েছেন বলে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসতিয়াক আশফাক রাসেল নয়া দিগন্তকে জানান, কখনো ডিবি, আবার কখনো র্যাব পরিচয়ে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে সাধারণ মানুষের সাথে এসব প্রতারণা করা হয়। তবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আগেভাগেই বেশকিছু প্রতারক চক্রকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। একইসাথে প্রতারকদের এসব অপরাধ যেন কোনোভাবেই সঙ্ঘটিত হতে না পারে, সে লক্ষ্যে ডিবির টিম সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ছদ্মবেশে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে দুই চাকরিচ্যুত সেনা সদস্যসহ মোট সাতজনকে আটক করা হয়।
এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি সিলভার রঙের টয়োটা মাইক্রোবাস, একটি লাল রঙের হিরো এক্সব্লেড মোটরসাইকেল, তিনটি র্যাবের কটি, দু’টি ওয়াকিটকি, একটি প্লাস্টিক ও একটি মেটালের খেলনা পিস্তল, দুই জোড়া হ্যান্ডকাফ, র্যাবের লোগোযুক্ত তিনটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি ইলেকট্রিক শক মেশিনসহ ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন— শরীয়তপুরের সখিপুর এলাকার ফরহাদ হোসেন (৪০), চাকরিচ্যুত সেনা সদস্য নওগাঁর বদলগাছি এলাকার নাদিম মাহমুদ শান্ত ওরফে রায়হান হোসেন (৩০), চাকরিচ্যুত সেনা সার্জেন্ট রাজবাড়ীর পাংশা এলাকার মিজানুর রহমান (৪১), বরগুনা সদরের আব্দুল আলীম (৩২), মাগুরা সদরের সাকিবুর জামান মেহেদী (২৬), ভোলার চরফ্যাশনের মেহেদী হাসান সুজন (৩৫) ও বরগুনা সদরের গাড়িচালক আবু হানিফ (৩২)।
একইদিন সন্ধ্যায় মুন্সীগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো: মেনহাজুল আলম।
তিনি বলেন, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ জানতে পারে, র্যাব পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীর স্বর্ণ ডাকাতির উদ্দেশ্যে একটি মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল নিয়ে একদল ডাকাত সিংপাড়ার দিকে যাচ্ছে। এ সময় জেলা গোয়েন্দা শাখার একটি টিম শ্রীনগর উপজেলার ছনবাড়ী-ইছাপুরা সড়কের হরিবাড়ী ব্রিজ এলাকায় চেকপোস্ট বসায়।
একপর্যায়ে দুপুর সোয়া ১টার দিকে সন্দেহভাজন গাড়ি দু’টিকে থামার সঙ্কেত দেয়া হয়। এ সময় মাইক্রোবাসের চালকের পাশের আসনে থাকা এক ব্যক্তি র্যাবের কটি পরা অবস্থায় নিজেকে র্যাব কর্মকর্তা পরিচয় দেন এবং ওয়াকিটকি দেখান। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে ডিবি সদস্যরা তাদের চ্যালেঞ্জ করেন। এ সময় তারা পালানোর চেষ্টা করলে ডিবি সদস্যরা ধাওয়া করে সাতজনকেই আটক করেন।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা জানান, শ্রীনগর বাজারের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রায় দেড় কেজি স্বর্ণ নিয়ে মুন্সীগঞ্জ সদরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাকে র্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে স্বর্ণালঙ্কার লুট করাই তাদের পরিকল্পনা ছিল।
জেলা পুলিশ সুপার মেনহাজুল আলম আরো বলেন, আটক ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েসহ আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে বাস ও মাইক্রোবাস থামিয়ে যাত্রীদের সর্বস্ব লুট করে আসছিলেন। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
এদিকে গত ২৪ জানুয়ারি ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের লৌহজং উপজেলার পদ্মা সেতুর উত্তর থানা এলাকা সংলগ্ন সড়কে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতির চেষ্টাকালে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
একইদিন এক্সপ্রেসওয়ের পদ্মা সেতুর টোল প্লাজা সংলগ্ন ৪ নম্বর লেনে দ্রুতগতির সন্দেহজনক একটি মাইক্রোবাসের গতিরোধ করে ভেতরে থাকা ছদ্মবেশী ডাকাত সদস্যদের আটক করা হয়। এ সময় ডাকাতদলের সদস্যদের তল্লাশি চালিয়ে একটি মাইক্রোবাস, একটি খেলনা পিস্তল, এক জোড়া হ্যান্ডকাপ, চারটি ডিবির কোটি, একটি ওয়ারলেস সেট ও চায়না লেজার লাইটসহ ডাকাতিকালে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
ডিবি পুলিশের ওই অভিযানে আটক ছয়জনের মধ্যে চাকরিচ্যুত ও সাময়িক বরখাস্তকৃত দু’জন পুলিশ সদস্য ও চাকরিচ্যুত একজন সেনা সদস্য ছিলেন।
এদিকে গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের হাঁসাড়া-ফেরিঘাট সার্ভিস লেনের পাশে বেজগাঁও এলাকায় ঝোপের আড়ালে ওৎ পেতে থেকে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে আন্তঃজেলা ডাকাতদলের ছয় সদস্যকে আটক করা হয়।
ওই দিন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শ্রীনগর থানার এএসআই ইয়ার মাহমুদ সঙ্গীয় ফোর্সসহ ডিউটিকালে জানতে পারেন, শ্রীনগর থানাধীন বেজগাঁও সাকিনস্থ ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের পাশে ঝোপের আড়ালে কতিপয় ব্যক্তি ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে ধারালো দেশীয় অস্ত্র ও ডাকাতি করার সরঞ্জামাদিসহ অবস্থান করে শলাপরামর্শ করছে। একপর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই স্থান থেকে আট-নয়জন পালানোর চেষ্টা করলে সঙ্গীয় ফোর্সের সহায়তায় ছয়জনকে আটক করে পুলিশ।
এ সময় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা স্বীকার করেন, গাড়িযোগে ঢাকা থেকে মাওয়ায় ঘুরতে আসা ব্যক্তিদের টার্গেট করে তারা সার্ভিস লেনের পাশে ঝোপের আড়ালে ওৎ পেতে থেকে ছিনতাই অথবা গাছ ফেলে ডাকাতি করে থাকে। এ অভিযানে অপরাধীদের হেফাজত থেকে চাপাতি, ধারালো ছুরি, টর্চ লাইট, পাটের রশি, কচস্টেপ উদ্ধারপূর্বক জব্দ করা হয়।
তবে জেলা পুলিশের মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়, সার্বিক নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিতে সদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ। নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বিশৃঙ্খলা ও মাদকের বিস্তার রোধে জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্পটে গোয়েন্দা নজরদারি, চেকপোস্ট ও টহল চলমান রয়েছে।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








