প্রাথমিক বিদ্যালয়
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়। নয়া দিগন্ত

বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় গত তিন বছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১৮১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ সময়ে শিক্ষার্থীসংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। প্রত্যন্ত ও নদী-খালবেষ্টিত এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে উপজেলার কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, কোনো কোনো শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বেশ কম। যে শ্রেণিতে আগে ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী থাকত, সেখানে এখন ১৫ থেকে ২০ জন বা তারও কম শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় পাঠদানের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক।

তিন বছর আগেও ভর্তি মৌসুমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ছিল ব্যস্ততা। নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য অভিভাবকদের আনাগোনা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কোলাহল—সব মিলিয়ে প্রাণচাঞ্চল্য থাকত। এখন অনেক বিদ্যালয়ে সেই চিত্র নেই। কোনো শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে, কোথাও আবার একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীকে একসাথে পাঠদান করতে হচ্ছে।

শিক্ষক ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। জন্মহার কমে যাওয়া, পরিবারের একাংশের শহরমুখী হওয়া, শিশুদের কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি এবং কাজের কারণে পরিবারের অন্যত্র চলে যাওয়া—এসব কারণের কথা তারা বলছেন। কিছু বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষকসঙ্কট ও পাঠদানের পরিবেশ নিয়েও অভিভাবকদের অসন্তোষ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, আগে ভর্তি মৌসুমে নতুন শিক্ষার্থী আনার জন্য আলাদাভাবে চিন্তা করতে হতো না। এখন অনেক এলাকায় শিক্ষার্থী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রেণিতে শিক্ষার্থী কম থাকায় পাঠদানের পরিবেশেও পরিবর্তন এসেছে।

অভিভাবক সদস্য শফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, অনেক অভিভাবক সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন বা বেসরকারি বিদ্যালয়ে দিচ্ছেন। আবার কাজের কারণে কিছু পরিবার শহর বা অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছে। সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ আরও ভালো করা গেলে অভিভাবকদের আস্থা বাড়বে।

অভিভাবক সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু জন্মহার কমে যাওয়াকে শিক্ষার্থী কমার কারণ হিসেবে দেখলে হবে না। বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষকের উপস্থিতি, পাঠদানের মান এবং অভিভাবকদের প্রত্যাশার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়গুলোর দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন।’

শিক্ষার্থী কমার পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসঙ্কটের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৮১টি বিদ্যালয়ের একটি বড় অংশে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। অনেক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্বে থাকা শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। শিক্ষকদের মতে, এতে বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে। কোন এলাকায় কী কারণে শিক্ষার্থী কমছে, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারণগুলো চিহ্নিত করে পাঠদানের পরিবেশ উন্নত করা এবং অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘গত বছরের নভেম্বর থেকে উজিরপুরে স্কুল ফিডিং চালু হয়েছে। এর পর ২০২৬ সালে আগের বছরের তুলনায় শিক্ষার্থীসংখ্যা বেড়েছে। শিক্ষকসঙ্কটের বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আলি সুজা বলেন, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ, অবকাঠামো ও শিক্ষকসঙ্কটসহ সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দফতরের সাথে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

শিক্ষাবিদদের মতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখতে শুধু ভর্তি বাড়ানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। শিক্ষার মান ও পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি শিক্ষকসঙ্কট দূর করা, নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের সাথে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি।