সিলিকন ভ্যালি,  নারী হেনেস্তা ও নিপীড়ন,  অভিযোগ, গোপন তালিকা,
সিলিকন ভ্যালি। সংগৃহীত

সিলিকন ভ্যালিতে নারী হেনেস্তা ও নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত শতাধিক ব্যক্তির নাম রয়েছে একটি গোপন তালিকায়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত পরিচিত ব্যক্তিরা। হেনেস্তা ও নিপীড়নের বিষয়ে একে অপরকে সতর্ক করতে নারীদের মধ্যে এই গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।

Advertisement

এনডিটিভি জানায়, নিউইয়র্ক পোস্ট এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকজনের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, একটি স্প্রেডশিটে এসব অভিযোগ লেখা রয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে মাদক প্রয়োগ করে অচেতন করা, হেনেস্তা ও ধর্ষণ।

‘তালিকায় অনেক পরিচিত মুখ’

সিলিকন ভ্যালির বিশের কোঠার এক নারী প্রযুক্তিকর্মী প্রথমবার তালিকাটি দেখে বিস্মিত হন। পরে এই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত কয়েকজন নারী তাঁর সাথে যোগাযোগ করেন। তখন তিনিও নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান।

তিনি বলেন, 'তালিকায় অনেক পরিচিত মুখ ছিল। নামকরা বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা ছিলেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁদের দেখেছি।'

ওই নারী জানান, খোঁজখবর নিতে গিয়ে তিনি এই গোপন নেটওয়ার্কের কথা জানতে পারেন। সেখানে শত শত ঘটনার বিবরণ রয়েছে। তবে অনেক নারী পুলিশের কাছে যেতে বা প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে ভয় পান। তাঁদের আশঙ্কা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে পেশাগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এক নারী বলেন, 'আমার ঘটনায় ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে হেরে গেলে শহরের সব বিনিয়োগকারী আমাকে কালো তালিকাভুক্ত করতে পারেন, এমন আশঙ্কা ছিল।'

বন্ধুত্বের আড়ালে হেনেস্তার অভিযোগ

অভিযোগের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে তথাকথিত ‘হ্যাকার হাউসে’। এসব বাড়িতে তরুণ উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তিকর্মীরা একসাথে থাকেন। সেখানে আড্ডা ও বন্ধুত্বের পাশাপাশি ব্যবসায়িক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। একই বাড়ির বাসিন্দারা পরে সহকর্মী, ব্যবসায়িক অংশীদার কিংবা বিনিয়োগকারী হয়ে উঠতে পারেন।

সিলিকন ভ্যালির এক অভিজ্ঞ ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, কিছু পুরুষ প্রথমে বন্ধুত্ব করে নারীদের আস্থা অর্জন করেন। পরে তাঁদের ব্যক্তিগত সীমা লঙ্ঘন করেন। তাঁর অভিযোগ, তরুণী, একাকী কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আসা নারীদের কেউ কেউ তাঁদের লক্ষ্যবস্তু হন। তবে হেনেস্তাকারী ও ভুক্তভোগী কোনো একটি লিঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

 অভিযোগের পরও গ্রেপ্তার হননি অভিযুক্ত

জেটে অ্যাপের প্রতিষ্ঠাতা ইয়েহং ঝু সান ফ্রান্সিসকোর জেনেসিস নামের একটি হ্যাকার হাউসের সাবেক এক বাসিন্দার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হেনেস্তার অভিযোগ তুলেছেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি পালিয়ে গেছেন। এখনো তাঁকে খুঁজে পাওয়া বা গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে তাঁদের পরিচিত মহলের সাথে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে।

ঝু বলেন, 'আমি তাঁকে বারবার না বলেছিলাম।'

তাঁর অভিযোগ, ঘটনার পর এক বান্ধবী অভিযুক্ত ব্যক্তির সুনাম নষ্ট হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ওই ব্যক্তিকে বাড়ি থেকে সরানোর উদ্যোগ নিলে একজন আয়োজক তাঁকে পুলিশের কাছে যেতে নিরুৎসাহিত করেন। বরং একটি কমিটি গঠন করে ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রস্তাব দেন।

পরে ঝু পুলিশের পাশাপাশি আইনজীবীদের সাথে যোগাযোগ করেন। অভিযুক্তকে খুঁজে বের করতে তাঁর পরিচিতদের সহায়তাও চান। তবে তাঁদের কেউ কেউ সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানান।

ঝু বলেন, 'আমরা একসাথে বিনিয়োগ করেছি। একসাথে ব্যবসা করেছি।'

অন্য বাড়িতে ভিন্ন অভিজ্ঞতা

বেভারলি হিলসের লঞ্চ হাউস নামের একটি উদ্যোক্তা সম্প্রদায়ের সাবেক এক বাসিন্দার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। এক অনুষ্ঠানে তাঁকে মাদক দেয়া হয়েছিল বলে তাঁর সন্দেহ হয়। ঘটনার রাতের কিছু অংশ তাঁর মনে নেই। পরে জানতে পারেন, এক বন্ধু তাঁকে বিছানায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, 'একই সাথে আমার কাঁপুনি হচ্ছিল, আবার ঘামছিলাম। মনে হচ্ছিল, ফ্লু হয়েছে। রোদে প্যাটিওতে বসে ছিলাম, নড়াচড়া করতে পারছিলাম না।'

পরে অন্য নারীরাও তাঁকে জানান, ওই একই ব্যক্তি তাঁদের অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেছেন বা হেনেস্তা করেছেন। তাঁরা একসাথে বাড়ির প্রতিষ্ঠাতাদের কাছে অভিযোগ করেন। ওই নারী জানান, অভিযুক্তকে সঙ্গে সাথেই বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। সহপ্রতিষ্ঠাতা ব্রেট গোল্ডস্টেইন ও আরেক প্রতিষ্ঠাতা তাঁদের সাথে কথা বলেন, বাড়ির তালা বদলে দেন এবং পুলিশের সাথে যোগাযোগে সহায়তার প্রস্তাব দেন।

তবে ঘটনার বিস্তারিত মনে না থাকায় এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে তা প্রমাণ করা সম্ভব হবে না বলে মনে করায় তিনি পুলিশের কাছে যাননি। তিনি জানান, বাড়িতে থেকে তিনি নিরাপদ বোধ করতেন। কিন্তু পরে ওই ব্যক্তি তাঁকে ও তাঁদের প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে ব্যক্তিগত বার্তাসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন বলে অভিযোগ করেন।

ওই নারী বলেন, 'আমি যদি কোনো ধরনের সাফল্য পাই এবং তা যদি প্রকাশ্যে আসে, তাহলে সে আবার ফিরে এসে আমাকে আরো কষ্ট দেবে—এটা নিয়ে আমি চিন্তিত।'

গোল্ডস্টেইন জানান, লঞ্চ হাউস এখন আর আগের মতো পরিচালিত হয় না। মানবসম্পদ, বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আচরণবিধি ও ঘটনার পর করণীয় ঠিক করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, 'সরাসরি মানুষের অংশগ্রহণে কোনো আয়োজন করলে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আয়োজকদের দায়িত্ব। এ জন্য কী করা হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করে আরো ভালো করতে হবে।'

বহুদিনের উদ্বেগ

প্রযুক্তি খাতের ঘনিষ্ঠ সামাজিক ও পেশাগত মহলে হেনেস্তা ও নিপীড়নের অভিযোগ নতুন নয়। ঘনিষ্ঠ সামাজিক ও পেশাগত সম্পর্কের এই পরিবেশে এ ধরনের ঘটনা নিয়ে বহু বছর ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।

২০২২ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক গবেষক কীর্থনা গোপালকৃষ্ণন ‘ইফেক্টিভ অ্যালট্রুইজম’ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শারীরিক চাপ প্রয়োগের বিষয়ে লেখেন। হেনেস্তা ও নিপীড়নের অভিযোগ মীমাংসায় গোষ্ঠীর ভেতরে মধ্যস্থতার ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।