গাড়িশিল্প
কমপ্যাক্ট বৈদ্যুতিক গাড়ি। নয়া দিগন্ত

বিশ্বের গাড়িশিল্পে বদলে যাচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য। দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি নির্মাণ ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেওয়া ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন চীনা নির্মাতাদের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখে। উৎপাদন ব্যয়, বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তর এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে ইউরোপের শিল্প যখন চাপে, তখন বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির বাজারে দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে চীনা কোম্পানিগুলো। এতে ইউরোপের শিল্প, কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

Advertisement

সোমবার (১২ অক্টোবর) প্যারিসের ভার্সাই প্রদর্শনী কেন্দ্রে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের বিশ্ব গাড়ি প্রদর্শনী। উদ্বোধনী দিনে এতে উপস্থিত ছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। নতুন মডেল, আধুনিক প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ উৎপাদন পরিকল্পনার পাশাপাশি ইউরোপীয় গাড়িশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা এবং ইউরোপে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ধরে রাখার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া ব্র্যান্ডগুলোর হিসাবে, ২১টি ব্র্যান্ড চীনে প্রতিষ্ঠিত অথবা চীনা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন। ইউরোপীয় ব্র্যান্ড রয়েছে ১৭টি এবং অন্যান্য অঞ্চলের ব্র্যান্ড আটটি। এই উপস্থিতি ইউরোপের গাড়িবাজারে চীনা নির্মাতাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ প্রদর্শনীর বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং নির্মাতাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তাকে ঐতিহাসিক সিট্রোয়েন ২সিভি থেকে অনুপ্রাণিত একটি ধারণাভিত্তিক গাড়িতে বসতে দেখা যায়। সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি ইউরোপে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। ফ্রান্স ও জার্মানির সহযোগিতায় ইউরোপীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষার কথাও বলেন তিনি। এর লক্ষ্য শুধু গাড়ি সংযোজন নয়; ব্যাটারি, যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থানও ইউরোপে ধরে রাখা।

চীনা নির্মাতাদের অগ্রগতির পেছনে রয়েছে বৃহৎ উৎপাদনক্ষমতা, ব্যাটারি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এবং দ্রুত নতুন মডেল বাজারে আনার সক্ষমতা। ব্যাটারির উপকরণ সংগ্রহ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সংযোজন পর্যন্ত বিস্তৃত সরবরাহব্যবস্থা তাদের প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

বৈদ্যুতিক গাড়ির পাশাপাশি হাইব্রিড গাড়িতেও গুরুত্ব দিচ্ছে চীনা কোম্পানিগুলো। আধুনিক নকশা, ডিজিটাল সুবিধা, ব্যাটারির সক্ষমতা এবং বিভিন্ন মূল্যসীমায় মডেল বাজারজাত করার কৌশল ইউরোপীয় ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। যদিও সব চীনা গাড়ি কম দামের নয়, কিছু ব্র্যান্ড উচ্চমূল্যের বাজারেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।

চীনের অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হলে বিদেশের বাজারে বিক্রি বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও মূল্য প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে ইউরোপীয় নির্মাতাদের বাজার হিস্যা, মুনাফা ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর।

চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও বেইজিংয়ের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ রয়েছে। শুল্ক, স্থানীয় উৎপাদনে প্রণোদনা এবং ইউরোপীয় শিল্প সুরক্ষার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। তবে আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করলেই ইউরোপের মৌলিক সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদন ব্যয় কমানো, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বাড়ানো, দ্রুত নতুন মডেল বাজারে আনা এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী গাড়ি তৈরি করাই দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান শর্ত।

প্রদর্শনীতে নতুন মডেল ও বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরছে ইউরোপীয় নির্মাতারা। স্টেলান্টিসের আটটি ব্র্যান্ডের প্রদর্শনীতে নয়টি ধারণাভিত্তিক গাড়ি এবং ৬০টির বেশি যানবাহন দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সিট্রোয়েন ২সিভি থেকে অনুপ্রাণিত একটি নতুন ধারণাভিত্তিক মডেল প্রদর্শন করেছে। রেনো ই-স্পেসের মাধ্যমে ভবিষ্যতের পারিবারিক গাড়ির ধারণা তুলে ধরেছে। পাশাপাশি মেগান ই-টেক বৈদ্যুতিক গাড়ির উন্নত সংস্করণও প্রদর্শনীতে এসেছে।

নির্মাতার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, উন্নত মেগান ই-টেক মডেলে রয়েছে ৬৭ কিলোওয়াট-ঘণ্টার লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারি। একবার পূর্ণ চার্জে গাড়িটি সর্বোচ্চ ৫০০ কিলোমিটার চলতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যাটারির চার্জ ১৫ থেকে ৮০ শতাংশে তুলতে প্রায় ২৪ মিনিট লাগতে পারে। তবে বাস্তবে গাড়ির চলার দূরত্ব ও চার্জের সময় নির্ভর করবে আবহাওয়া, চালানোর ধরন এবং চার্জারের সক্ষমতার ওপর।

স্টেলান্টিসের অধীন ডিএস অটোমোবাইলস নতুন ডিএস এন°৭ বিলাসবহুল স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল (এসইউভি) প্রদর্শন করেছে। এ ছাড়া ফিয়াটের গ্রিজলি, ল্যান্সিয়ার গামা, ওপেলের করসা জিএসই এবং ভবিষ্যৎ নকশার স্টিএক্স ধারণাভিত্তিক গাড়িও রয়েছে প্রদর্শনীতে। লিপমোটরের বি০৩ বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ডি১৯ বহুমুখী গাড়ির উপস্থিতি স্টেলান্টিসের প্রদর্শনীতে ইউরোপীয়-চীনা সহযোগিতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে।

জার্মান নির্মাতা ভক্সওয়াগেন প্রদর্শন করেছে নতুন আইডি টিগুয়ান বৈদ্যুতিক গাড়ি। স্কোডা এনেছে ইপিক ও পিক—এর মধ্যে একটি শহুরে ব্যবহারের উপযোগী, অন্যটি সাত আসনের পারিবারিক গাড়ি হিসেবে উপস্থাপিত। আলপিন পিএস১ ধারণাভিত্তিক গাড়ির পাশাপাশি এ১১০, এ২৯০ ও এ৩৯০ মডেলের নতুন সংস্করণও দেখিয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য বিলাসবহুল গাড়ির পাশাপাশি দৈনন্দিন ব্যবহার উপযোগী ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারেও প্রতিযোগিতা বাড়ানো।

চীনা নির্মাতাদের মধ্যে বিওয়াইডি, চেরি ও লিপমোটর ইউরোপে বাজার সম্প্রসারণে সক্রিয়। এ প্রতিযোগিতায় গাড়ির দাম, ব্যাটারি প্রযুক্তি, উৎপাদন ব্যয় এবং দ্রুত নতুন মডেল বাজারে আনার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্টেলান্টিসের প্রায় ১৫ হাজার ইউরো দামের সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়ির পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে। তবে এই দামকে চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। উৎপাদন সংস্করণ, কর ও অন্যান্য খরচের কারণে প্রকৃত দাম পরিবর্তিত হতে পারে।

ইউরোপের শিল্পসংকটের চিত্র জার্মান গাড়ি নির্মাতাদের অবস্থানেও স্পষ্ট। ভক্সওয়াগেন, বিএমডব্লিউ ও মার্সিডিজ-বেঞ্জ চীনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন এবং বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তরের ব্যয়ের চাপে রয়েছে। উৎপাদন ও ব্যয় কাঠামো পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ভক্সওয়াগেন ৫০ হাজার পদ কমানোর পরিকল্পনা করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পদক্ষেপের প্রভাব গাড়ি কারখানার বাইরেও পড়তে পারে—যন্ত্রাংশ উৎপাদন, পরিবহন, প্রকৌশল পরিষেবা এবং গাড়িশিল্পনির্ভর অঞ্চলগুলোর অর্থনীতিতে তৈরি হতে পারে বাড়তি চাপ।

ফ্রান্সের রেনো, পিউজো ও সিট্রোয়েনের সামনেও রয়েছে সাশ্রয়ী গাড়ি উৎপাদন, বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন ব্যয় বেশি থাকলে চীনা গাড়ির সাথে দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। আবার প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়লেও ক্রেতা ধরে রাখা সম্ভব হবে না।

এ পরিস্থিতিতে ইউরোপে স্থানীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার সাথে ইউরোপে গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ উৎপাদনের শর্ত যুক্ত করার পক্ষে। তাদের যুক্তি, সরকারি অর্থের সুবিধা নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ইউরোপের স্বার্থও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

তবে এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলোর স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। ফ্রান্স শিল্প সুরক্ষা ও স্থানীয় উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিলেও জার্মান নির্মাতাদের ব্যবসা আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা এবং বিদেশি বাজারের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে শিল্প সুরক্ষা, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা নীতিনির্ধারকদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

চীনা গাড়ির সরবরাহ বাড়লে ক্রেতাদের সামনে বিকল্প বাড়বে এবং তুলনামূলক কম দামে উন্নত প্রযুক্তির গাড়ি কেনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ব্যাটারির স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা, মেরামতের সুবিধা, পুনর্বিক্রয়মূল্য এবং বিক্রয়োত্তর সেবাও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ইউরোপীয় নির্মাতাদের বিক্রি কমলে উৎপাদন, গবেষণা ও কর্মসংস্থানে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে প্যারিসের গাড়ি প্রদর্শনী বিশ্ব গাড়িশিল্পে পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্য তুলে ধরছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপকে শুধু রফতানির বাজার হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্র হিসেবেও দেখছে। বিপরীতে ইউরোপীয় নির্মাতাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে উৎপাদন ব্যয় কতটা কমানো যায়, সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়ি কত দ্রুত বাজারে আনা যায় এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি কর্মসংস্থান কতটা ধরে রাখা সম্ভব হয় তার ওপর। চীনা আমদানি নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত, ইউরোপে স্থানীয় উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং দুই পক্ষের শিল্পকৌশলই আগামী দিনে বিশ্ব গাড়িবাজারের প্রতিযোগিতার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।