কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, প্রতিরক্ষা চুক্তি, বদর,যুক্তরাষ্ট্র,ইসরাইল, যুদ্ধ, ইরান, নিরাপত্তা জোরদার,
২১ অক্টোবর কাতারের রাজধানী দোহায় কাতার, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘বদর’ চুক্তি সই করে। দ্য ডন

যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তায় আঞ্চলিক সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ

Advertisement

কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়াতে বুধবার নতুন চুক্তি করেছে। দীর্ঘস্থায়ী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ এবং ইরানের সাথে সংঘাত ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করতে নতুন অংশীদার খুঁজছে। ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর কাতারের রাজধানী দোহায় ‘বদর’ চুক্তিতে সই করে এই  চার দেশ।

আল জাজিরা ২১ অক্টোবর জানায়, এই সমঝোতার আওতায় চার দেশ যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং সরবরাহব্যবস্থার সমন্বয় বাড়াবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সমঝোতা না হওয়ায় আঞ্চলিক দেশগুলো প্রতিরক্ষার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চাইছে। তবে এর অর্থ পুরোনো মিত্রদের ছেড়ে যাওয়া নয়। বিদ্যমান সম্পর্ক বজায় রেখেই নিজেদের নিরাপত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো তাদের লক্ষ্য।

প্রতিরক্ষা শিল্প বিশ্লেষক ও মার্জেন অ্যানালিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরদা মেভলুতোগলু আল জাজিরাকে বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি আন্তঃসংযুক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে পারে। এটি একক কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের চেয়ে বিস্তৃত হবে।

চুক্তিতে কী থাকছে

কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘বদর’ সমঝোতার লক্ষ্য চার দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে সহযোগিতা বাড়ানো, সামরিক সক্ষমতা জোরদার করা এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ নেয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তুরস্ক দেবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বিভিন্ন ব্যবস্থা একীভূত করার সক্ষমতা ও উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প। পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া দেবে উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং বড় অভ্যন্তরীণ বাজার। কাতার জোগাবে বিনিয়োগ।

এর ফলে চার দেশ যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম তৈরি, উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক আলবার্ট ভিদাল বলেন, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া তুরস্কের অস্ত্র কিনতে এবং নিজেদের দেশেই এর কিছু অংশ উৎপাদন করতে আগ্রহী। এতে তুর্কি কোম্পানিগুলোর খরচ কমতে পারে এবং পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ায় কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে কাতার দিতে পারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ।

পুরোনো সহযোগিতার নতুন কাঠামো

তুরস্কের সাথে বাকি তিন দেশেরই আগে থেকে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা রয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে কাতার ও তুরস্ক দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা শিল্পবিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই করে।

তুরস্কের সাথে পাকিস্তানের চারটি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ প্রকল্প রয়েছে। এর দুটি ইস্তাম্বুলে এবং দুটি করাচি শিপইয়ার্ডে নির্মাণের কথা। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্ক যৌথভাবে একটি ট্যাংক তৈরি করছে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক বুরজু ওজচেলিক বলেন, প্রতিটি নতুন চুক্তির জন্য আলাদা করে শুরু না করে বিদ্যমান অস্ত্র রপ্তানি ও যৌথ উৎপাদন প্রকল্পগুলোকে একটি সুসংগঠিত ও টেকসই নেটওয়ার্কের আওতায় আনাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কি কমবে

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ এবং সৌদি আরবে হাউছিদের সাম্প্রতিক হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের ঘাটতির খবরও নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ জোরালো করতে পারে।

তবে মেভলুতোগলু মনে করেন, এ চুক্তিকে ওয়াশিংটন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কাতার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক ছাড়বে না। তুরস্কও ন্যাটো থেকে বেরিয়ে নয়, বরং জোটের ভেতরে থেকেই প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা বাড়াতে চায়।

চ্যাথাম হাউসের গবেষক বাদের মুসা আল-সাইফের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য মুসলিম দেশের দিকেও বেশি ঝুঁকছে।

এর পাশাপাশি, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক গত আগস্টে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার রয়েছে। বুধবার চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য তুরস্কের পার্লামেন্টে পাঠানো হয়েছে। তবে বিদেশে তুর্কি সেনা মোতায়েনের জন্য আলাদা সংসদীয় অনুমোদন লাগবে।

দোহার চুক্তিটি পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার নয়; বরং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা নিয়ে। মেভলুতোগলুর মতে, মক্কা চুক্তি যেখানে সম্মিলিত প্রতিরোধ ও সামরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেয়, সেখানে দোহার উদ্যোগ এ ধরনের অংশীদারত্বের শিল্প ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।