
নিখোঁজ ছেলের একটি ছবি হাতে নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার ওপর আশায় বুক বেঁধে আছেন রাজেশ রাম। নেপালে ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ হয়ে যাওয়া স্বজনদের খুঁজতে থাকা হাজারো মানুষের মতো তিনিও অপেক্ষা করছেন কোনো উত্তর পাওয়ার জন্য।
৫৩ বছর বয়সী রাম বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমি তাকে সব জায়গায় খুঁজেছি, কিন্তু তার লাশ পাইনি।’
তার ছেলে সুরোজ কুমার বেত্রাবতীতে একটি গ্যারেজে মেকানিক হিসেবে কাজ করতেন। বন্যায় ওই এলাকা পুরোপুরি প্লাবিত হয়।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর বরফঠান্ডা পানি ও ধ্বংসাবশেষের সুনামির মতো ঢল নেমে আসে। এতে নেপালে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়।
এখন নিখোঁজ ও মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করাই কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজার হাজার ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করতে হচ্ছে। এর সাথে রয়েছে খণ্ডিত লাশ, সীমিত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জনবলের সঙ্কট।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, লাশের সাথে স্বজনদের ডিএনএ মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এক হাজার ৪৫৪টি লাশ উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খণ্ডিত দেহাবশেষ।
এখন পর্যন্ত মাত্র ১১২টি লাশ শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নেপালে আরো পাঁচ হাজার ২৮৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকশ বিদেশীও রয়েছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫১৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
দুই দেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৫০০ এবং নিখোঁজ প্রায় পাঁচ হাজার ৮০০ জন।
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে থাকা দু’টি ফরেনসিক গবেষণাগারে বিশেষজ্ঞরা ডিএনএ নমুনার প্রোফাইল তৈরি ও একটি বড় ডেটাবেস তৈরির কাজ করছেন। এর আগে এত বড় পরিসরে এমন কাজ তাদের করতে হয়নি।
ন্যাশনাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুকুল প্রধান বলেন, ‘এক বছরে আমরা সাধারণত এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০টি নমুনা পরীক্ষা করতাম। এর মধ্যে পিতৃত্ব নির্ধারণ বা অপরাধস্থলের নমুনাও থাকত। এখন আমরা হাজার হাজার নমুনা পরীক্ষা করছি।’
‘ব্যথাটা আমরা বুঝতে পারছি’
মোট তিন হাজার ৬৮৫টি ফরেনসিক নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মধ্যে উদ্ধার করা লাশ থেকে সংগ্রহ করা নমুনার সংখ্যা এক হাজার ৩০০-এর বেশি।
রক্তের নমুনা থেকে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি তুলনামূলক সহজ। তবে দাঁত বা হাড় থেকে নেয়া নমুনা পরীক্ষা করতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
নেপাল ইতোমধ্যে এক হাজার ২০০টির বেশি লাশ দাফন করেছে। প্রতিটি লাশের সাথে নম্বর ও পরিচিতিচিহ্ন যুক্ত করা হয়েছে, যাতে পরে ডিএনএ পরীক্ষায় কোনো স্বজনের সাথে মিল পাওয়া গেলে লাশটি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায়।
নেপালের পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে বলেন, ‘অনেক মানুষ নিখোঁজ এবং যেসব লাশ পাওয়া গেছে, সেগুলোর পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন। মানুষ যে কী যন্ত্রণার মধ্যে আছেন, আমরা তা বুঝতে পারছি। আমাদের দলগুলো আন্তরিকভাবে কাজ করছে।’
ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রধান নিরাজন থাপা বলেন, বন্যার পানিতে কিছু লাশ অনেক দূরে ভেসে যাওয়ায় শনাক্তকরণ আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘ভূমিকম্প বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সাধারণত নির্দিষ্ট একটি এলাকায় লাশ পাওয়া যায়। ফলে তুলনামূলক সীমিতসংখ্যক নমুনার সাথে ডিএনএ মিলিয়ে দেখা যায়। কিন্তু এবার সেই পরিসর অনেক বড়।’
শুধু লাশ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করলেই পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না। এজন্য কোনো নিকটাত্মীয়ের ডিএনএ নমুনার প্রয়োজন হয়।
থাপা বলেন, ‘শুধু কারো ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করলেই তাকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তার স্বজনদের কাছ থেকেও ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করে সেটির সাথে তুলনা করতে হবে।’
অর্থাৎ, পরিচয় নিশ্চিত করতে একদিকে অজ্ঞাতনামা লাশের নমুনা এবং অন্যদিকে হাজারো স্বজনের নমুনা—দু’টিই পরীক্ষা করতে হবে।
নেপালের এই কাজে সহায়তা করতে প্রতিবেশী ভারত ও চীন, পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশ বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের আঙুলের ছাপ শনাক্তকরণ বিশেষজ্ঞরাও সহায়তা করছেন।
থাপা জানান, এসব সহায়তার ফলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই লাশ ও স্বজনদের ডিএনএ মিলিয়ে শনাক্তকরণের কাজ শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
তবে ফলাফল না আসা পর্যন্ত নিখোঁজদের পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তা ও গভীর মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নিখোঁজ স্বজনদের কয়েকটি পরিবার এরই মধ্যে প্রতীকীভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে।
রাজেশ রামও জানেন না, শেষ পর্যন্ত তিনি কোনো উত্তর পাবেন কি-না।
তিনি বলেন, ‘আমি অপেক্ষা করছি, যদি আমার ছেলের কোনো দেহাবশেষ খুঁজে পাই।’
সূত্র : বাসস
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








