
ভারতের দাবি করা হিমালয়ের একটি বিতর্কিত অঞ্চলে পাকিস্তান ও চীন গত সপ্তাহে সীমান্ত চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করেছে। এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারত দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় পাকিস্তান-চীন সীমান্তকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে আসছে।
বিবিসি (২১ সেপ্টেম্বর) জানায়, পাকিস্তান ও চীন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও যোগাযোগ সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে একটি যৌথ সীমান্ত কমিশন গঠন করেছে। পাকিস্তান এই চুক্তিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে ভারত বলেছে, দেশটি ভারতীয় ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করা এলাকায় পাকিস্তান-চীন সীমান্তের কোনো স্বীকৃতি দেয় না। পাশাপাশি এ ধরনের চুক্তির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই বলে দাবি করেছে।
বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ভারত ও চীন কয়েক বছর ধরে চলা সামরিক উত্তেজনার পর নিজেদের সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। দুই দেশের হিমালয় সীমান্তের বিস্তীর্ণ অংশে সেনাদের অবস্থান আলাদা করা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। একই সময়ে, ভারতের দাবিকৃত সীমান্তের সংলগ্ন এলাকায় পাকিস্তানের সাথে সহযোগিতা আরো গভীর করছে বেইজিং।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। তথাকথিত যৌথ কমিশন আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। এ চুক্তির কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’
নতুন কমিশনের আওতায় থাকা সীমান্তের মধ্যে রয়েছে শাকসগাম উপত্যকা। প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চলটি ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান চীনের কাছে হস্তান্তর করে। তবে ভারত এটিকে লাদাখের অংশ হিসেবে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করছে।
নয়াদিল্লির বক্তব্য, অঞ্চলটি সাবেক জম্মু ও কাশ্মীরের দেশীয় রাজ্যের অংশ ছিল। পাকিস্তান সেটি অবৈধভাবে দখল করার পর চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ভারত সরকার ১৯৬৩ সালের চুক্তিকে কখনো স্বীকৃতি দেয়নি এবং একে অবৈধ ও অকার্যকর বলে মনে করে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘অবৈধ ও জোরপূর্বক দখল করে রাখা ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার পাকিস্তানের নেই।’
অন্যদিকে, পাকিস্তানের বক্তব্য, জম্মু ও কাশ্মীর এখনো একটি বিতর্কিত অঞ্চল। ফলে ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার ভারতের নেই। ইসলামাবাদ চুক্তিটিকে বৈধ বলে মনে করে।
দিল্লির শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও শাসনব্যবস্থা বিভাগের অধ্যাপক জোবিন টি জ্যাকব বলেন, নতুন উদ্যোগটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং পুরোনো একটি কাঠামোকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান চুক্তিতেই যৌথ সীমান্ত কমিশনের বিধান ছিল। এখন মূল প্রশ্ন হলো, সেটি কার্যকর করার সময়টি কেন বেছে নেয়া হয়েছে।
জ্যাকবের মতে, চীনের সীমান্তগুলো চিহ্নিত করার বৃহত্তর উদ্যোগ এবং পাকিস্তানের অন্যান্য সীমান্তে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার সময়ে সীমান্তজুড়ে যোগাযোগ ও চলাচলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার ইচ্ছা—এ দুটো বিষয় সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, ভারতের এই ঘটনায় ‘উদ্বিগ্ন’ হওয়া উচিত। বিশেষ করে ১৯৬৩ সালের চুক্তির একটি বিধানকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কাশ্মীর বিরোধের নিষ্পত্তির পর যে দেশ ওই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার সাথে চুক্তিটি পুনরায় আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছিল।
জ্যাকব আরো বলেন, আন্তর্জাতিক তথ্য ও গণমাধ্যমের পরিসরেও ভারত সমস্যার মুখে রয়েছে। তাঁর মতে, চীনের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও তথ্যপরিসরে তুলনামূলক প্রভাব বেশি। সিজিটিএন, সিআরআই এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতির মাধ্যমে বেইজিং বিশ্বজুড়ে নিজেদের বক্তব্য ও মানচিত্র তুলে ধরতে পারে। বিপরীতে, ভারতের প্রতিবাদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক সময় উপেক্ষিত হয়।
তবে সীমান্তের বাস্তব ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আলাদা। পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে এ অঞ্চলে আগে থেকেই বিস্তৃত অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) এবং কারাকোরাম মহাসড়ক।
যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বর্তমানে আনোয়ার গারগাশ কূটনৈতিক একাডেমি এবং হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো হুসাইন হাক্কানি বলেন, নতুন কমিশনটি একই সাথে বাস্তবভিত্তিক ও রাজনৈতিক।
তিনি বলেন, ‘এটি দুটিরই সমন্বয়। সীমান্ত ও সীমানা সহযোগিতা বাড়ানো, অবৈধ পারাপার ঠেকানো এবং সিপিইসির সাথে যুক্ত কৌশলগত অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখার জন্য এটি একটি ব্যবস্থা।’
হাক্কানির মতে, ভারতকে এটিও বোঝানো হয়েছে যে, কাশ্মীর প্রশ্নে চীন এখনো পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে অবস্থান করছে। তিনি বলেন, চীন কাশ্মীর বিষয়ে ভারতের অবস্থান কখনো মেনে নেয়নি। গিলগিট-বালতিস্তানকেও বেইজিং পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়।
পাকিস্তান-চীন সীমান্ত কমিশন কার্যকর করার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন হাক্কানি। তাঁর মতে, চীন সাধারণত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর আগেই পরিকল্পনা করে। তাই কমিশন কার্যকর করার সিদ্ধান্তও অনেক আগে নেয়া হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ব্রিকস সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সফরের পর এই তথ্য প্রকাশের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তানকে কৌশলগত অংশীদারত্বের বিষয়ে আশ্বস্ত করা এবং ভারতকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে বহুপক্ষীয় যোগাযোগের অর্থ দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন নয়।
তবে জ্যাকব সতর্ক করে বলেন, এই ঘটনাকে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাঁর ভাষায়, ‘এই মুহূর্তে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ওপর এর কোনো তাৎক্ষণিক বা দৃশ্যমান প্রভাব নেই।’
গত সপ্তাহের ঘোষণায় হিমালয়ের বিতর্কিত সীমান্তে এখনই বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। ভারত যে ব্যবস্থাগুলো এতদিন প্রত্যাখ্যান করে আসছে, সেগুলো ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে।
জয়সওয়াল বলেন, ভারতের অবস্থান ‘স্পষ্ট ও ধারাবাহিক’। নয়াদিল্লি যে ভূখণ্ডকে পাকিস্তানের অবৈধ দখলে থাকা ভারতীয় এলাকা বলে মনে করে, সেটিকে বৈধতা দেয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা অগ্রহণযোগ্য। এর মাধ্যমে ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।
তবে হাক্কানির মতে, এই বিরোধ কেবল সীমান্তের আইনগত বিষয় নিয়ে নয়। তিনি বলেন, ‘ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত ও সীমানা নিয়ে মূল মতপার্থক্য মানচিত্রভিত্তিক নয়, ভূকৌশলগত। তাই সীমান্ত আলোচনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ বিরোধ সমাধানেরও একটি সীমা রয়েছে।’
হাক্কানি আরো বলেন, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে চীনের ‘দ্বিতীয় প্রতিরোধক’ হিসেবে কাজ করে চলেছে। ইসলামাবাদের সাথে বেইজিংয়ের যোগাযোগ নয়াদিল্লির কাছে সেই বার্তাই অব্যাহতভাবে পৌঁছে দেবে।







