
চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্যে অধ্যয়নরত কয়েক ডজন আফগান শিক্ষার্থীকে পাকিস্তানের মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে দেশে ফেরত পাঠানোর মেডিক্যাল বোর্ডের আদেশ শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) স্থগিত করেছেন দেশটির একটি আদালত।
এএফপি’র দেখা লাহোর আদালতের এক আদেশে বলা হয়েছে, ‘লাহোর হাইকোর্ট মেডিক্যাল কলেজ থেকে শতাধিক আফগান শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার ঠেকাতে দেয়া স্থগিতাদেশ পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত বহাল রেখেছেন।’
করাচি থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
বিচারপতি খালিদ ইসহাক পরবর্তী শুনানির কোনো তারিখ নির্ধারণ করেননি।
বেলুচিস্তান প্রদেশের একটি আদালত ইতোমধ্যে একই ধরনের একটি আবেদন খারিজ করেছেন। আর সিন্ধু প্রদেশে আরেকটি আবেদন বিচারাধীন রয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তান মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (পিএমডিসি) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়ে জানায়, ‘চলতি শিক্ষাবর্ষে আফগান নাগরিকদের কোনো ধরনের সহায়তা দেয়া যাবে না।’
এই আদেশে আফগান শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। তাদের একজন এএফপিকে বলেন, ‘আমার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে বলে মনে হয়েছিল।’
কলেজের ডিনদের কাছে পাঠানো পিএমডিসির চিঠিতে বলা হয়, পাকিস্তানে আগে থেকে মেডিক্যাল বা ডেন্টাল প্রোগ্রামে ভর্তি থাকা আফগানদের দেশে ফিরে যেতে হবে।
এএফপি’র দেখা চিঠিতে মেডিক্যাল কাউন্সিল কোন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এ পদক্ষেপ নিয়েছে, তা বলা হয়নি। তবে এতে বলা হয়েছে, ‘বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের এবং জাতীয় নীতিগত নির্দেশনার সাথে সম্পর্কিত।’
২০২১ সালে কাবুলে তালেবান সরকার ক্ষমতায় ফেরার পর প্রতিবেশী পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে। চলতি বছরের শুরুতে কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধে তা আরো তীব্র আকার নেয়।
জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে ২৫ লাখের বেশি আফগান পাকিস্তান থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন অথবা স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়েছেন। তাদের অনেকেই কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছিলেন। ইসলামাবাদের চলমান প্রত্যাবাসন অভিযানের অংশ হিসেবে তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কর্তৃপক্ষকে পিএমডিসির আদেশ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। আফগানিস্তানে নারীদের পড়াশোনা নিষিদ্ধ থাকায় তাদের দুর্ভোগের বিষয়টি তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ পদক্ষেপকে ‘বৈষম্যমূলক ও স্বেচ্ছাচারী’ বলে সমালোচনা করেছে।
লাহোরে করা আবেদনের আবেদনকারীদের একজন ২৩ বছর বয়সী নারী। দ্বিতীয় বর্ষের পড়াশোনা শেষ হতে যখন মাত্র কয়েক দিন বাকি, তখন তাকে বলা হয়, ‘ফিরে যেতে হবে এবং সবকিছু ছেড়ে যেতে হবে।’
১১ সেপ্টেম্বর একজন বিচারক প্রাদেশিক পর্যায়ে বহিষ্কারের আদেশ স্থগিত করেন। তবে ওই শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে এরই মধ্যে তার সব নথি মুছে দেয়া হয়েছে।
‘কখনো হাল ছাড়ব না’
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষার্থী আফগানিস্তানে তালেবান কর্তৃপক্ষ নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা নিষিদ্ধ করার পর সেখানে তার মেডিক্যাল পড়াশোনা ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তিনি বলেন, পাকিস্তানে বৃত্তি পাওয়া প্রায় ২০ জন আফগান নারীর একজন তিনি। এ বৃত্তির জন্য ৩০ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে থেকে তাদের নির্বাচন করা হয়েছিল।
কাবুল থেকে ফোনে এএফপির এক সাংবাদিককে তিনি বলেন, ‘আমি কখনো হাল ছাড়ব না। এই যাত্রা থেকে আমি শিখেছি, দুঃখ কোনো কিছু বয়ে আনে না।’
লাহোরে শিক্ষার্থীদের পক্ষে থাকা কয়েকজন আইনজীবীর একজন আসাদ জামাল পিএমডিসির আদেশের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এসব আদেশে চিকিৎসকদের ‘তাদের বক্তব্য জানানোর কোনো সুযোগই দেয়া হয়নি।’
পিএমডিসি এএফপির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
জামাল বলেন, লাহোরের আবেদনে শিক্ষার্থীরা হেরে গেলেও মামলাটি পাকিস্তানের ফেডারেল সাংবিধানিক আদালতে নেয়া যেতে পারে।
লাহোরের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মুবিন উলফাত হাসপাতালে কাজের পালা শেষ করে ফেরার পর তাকে দেশ ছাড়ার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় দেয়া হয়।
২৪ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী এএফপিকে বলেন, ‘আমরা মেডিক্যাল শিক্ষার্থী। আমরা কীভাবে চমকে দেয়া খবর সামলাতে হয়, তা জানি। কিন্তু এটি এমন কিছু ছিল না, যা সহজে সামলানো যায়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার।’
আদেশ জারির আগেই কয়েকজন আফগান চিকিৎসা শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। তাদের মধ্যে চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থীও রয়েছেন, যিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ভিসা নবায়নের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
চক্ষুবিদ্যায় বিশেষায়িত ওই চিকিৎসা শিক্ষার্থী নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘আমরা শুধু শিক্ষার্থী। আমরা রাজনৈতিক মানুষ নই।’
৩৩ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থীকে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে নেয়া হয় এবং দুই দিনের মধ্যে বহিষ্কার করা হয়।
তিনি বলেন, ‘দয়া করে আমাদের পড়াশোনা শেষ করতে দিন। আমরা পড়াশোনা শেষ করব। তারপর আমাদের দেশে ফিরে যাব।’ বাসস







