
সৌরজগতের উৎপত্তি ও পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের রহস্য উন্মোচনে সহায়তার লক্ষ্যে মঙ্গলের উপগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার একটি ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে জাপান। মঙ্গল অঞ্চলে গিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসার এটিই হবে প্রথম অভিযান বলে আশা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মহাকাশ সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে মনুষ্যবিহীন ‘মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন’ (এমএমএক্স) অভিযান। এটি ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষের অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন অ্যাজেন্সির (জাক্সা) বরাত দিয়ে টোকিও থেকে এএফপি জানিয়েছে, এমএমএক্স মহাকাশযান বহনকারী এইচ-৩ রকেটটি মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) জাপানের তানেগাশিমা মহাকাশকেন্দ্র থেকে স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৪১ মিনিটে উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী, তা হবে সোমবার রাত ৭টা ৪১ মিনিট।
মহাকাশযানটি প্রায় এক বছর পর মঙ্গলের কাছে পৌঁছাবে। সেখানে এটি মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোসকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ তিন বছর প্রদক্ষিণ করবে। এরপর উপগ্রহটির পৃষ্ঠে অবতরণ করে কমপক্ষে ১০ গ্রাম উপাদান সংগ্রহ করবে।
অবতরণের আগে ‘আইডেফিক্স’ নামের একটি রোভার ফোবোসের পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করবে, যাতে নিরাপদে অবতরণের উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা যায়। ফরাসি কমিকসের জনপ্রিয় চরিত্র অ্যাস্টেরিক্সের কুকুরের নাম অনুসারে রোভারটির নাম রাখা হয়েছে।
এমএমএক্স প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ইয়াসুহিরো কাওয়াকাতসু এএফপিকে বলেন, ‘ফোবোস থেকে নমুনা সংগ্রহ অবশ্যই বিশ্বে প্রথম। তবে এর অর্থ হলো, মঙ্গল ব্যবস্থায় গিয়ে আবার ফিরে আসারও এটিই প্রথম অভিযান।’
জাক্সা জানায়, এ অভিযানে ফোবোসকে ‘প্রাকৃতিক মহাকাশ স্টেশন’ হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে। মঙ্গলে যাওয়া ও ফিরে আসার প্রয়োজনীয় শর্তগুলো নির্ধারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে মানুষবাহী মঙ্গল অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেয়া হবে।
পাশাপাশি মহাকাশযানটি মঙ্গলের অপর উপগ্রহ ডেইমোসও পর্যবেক্ষণ করবে। তবে সেখানে অবতরণ না করে নমুনা নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসবে।
মঙ্গলের উপগ্রহের উৎপত্তি নিয়ে অনুসন্ধান
জাক্সার আশা, এ অভিযান মঙ্গল ও এর দুই উপগ্রহ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়ে নতুন তথ্য দেবে। সৌরজগতের জন্মের রহস্য বোঝার জন্য এ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
মঙ্গলের উপগ্রহগুলোর উৎপত্তি নিয়ে একটি তত্ত্ব হলো ‘বিশাল সংঘর্ষ অনুমান’। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার পর উপগ্রহ দু’টি সৃষ্টি হয়।
অন্য তত্ত্বটি ‘মহাকর্ষীয় আকর্ষণে বন্দী হওয়ার অনুমান’। এতে বলা হয়, উপগ্রহ দু’টি মূলত গ্রহাণু, যেগুলো মঙ্গলের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে আটকা পড়ে।
কোন তত্ত্বটি সঠিক, তা নির্ধারণ করা গেলে পাথুরে গ্রহগুলোতে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে বলে জাক্সা জানিয়েছে। সূর্যের সবচেয়ে কাছের চারটি পাথুরে গ্রহ হলো বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গল।
আইডেফিক্স প্রকল্পে যুক্ত ফরাসি জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী প্যাট্রিক মিশেল বলেন, ‘এমএমএক্স সৌরজগতের বাইরের অঞ্চল থেকে ভেতরের পাথুরে গ্রহাঞ্চলে পানি, উদ্বায়ী পদার্থ ও জৈব যৌগ পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোকপাত করবে। এসব প্রক্রিয়া গ্রহগুলোকে প্রাণের উপযোগী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ফোবোস ও ডেইমোস যদি সত্যিই এসব প্রাচীন সরবরাহব্যবস্থার অবশিষ্টাংশ হয়, তাহলে এগুলোতে প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কে—অথবা আরো নির্ভুলভাবে বললে, পাথুরে গ্রহে প্রাণের উদ্ভবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর পরিবহন সম্পর্কে—সূত্র থাকতে পারে।’
মঙ্গলের মহাকর্ষীয় টান থেকে বেরিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ
এমএমএক্স অভিযানটি ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর স্পেস স্টাডিজ (সিএনইএস), জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার (ডিএলআর), যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) এবং প্রায় ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে।
জাক্সার বিজ্ঞানীরা জানান, মহাকাশযানের অবতরণ-উপযোগী পা তৈরি করা ছিল প্রকল্পের অন্যতম কঠিন কাজ। কারণ ফোবোসে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ অত্যন্ত দুর্বল।
২০২৪ সালে জাপানের মনুষ্যবিহীন ‘স্মার্ট ল্যান্ডার ফর ইনভেস্টিগেটিং মুন’ (স্লিম) চাঁদে অবতরণের পর কাত হয়ে পড়েছিল। তবে ওই ‘মুন স্নাইপার’ মহাকাশযানটি তথ্য পাঠাতে সক্ষম হয় এবং চাঁদের দুই সপ্তাহব্যাপী কয়েকটি রাতও টিকে ছিল।
মহাকাশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে জাপানের। জাক্সার মনুষ্যবিহীন ‘হায়াবুসা-২’ মহাকাশযান ২০২০ সালে পৃথিবী থেকে কয়েকশ কোটি কিলোমিটার দূরের একটি গ্রহাণু থেকে সংগ্রহ করা ৫ দশমিক ৪ গ্রাম পাথর ও ধুলিকণা নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে।
তবে আগের গ্রহাণু অভিযানের সাথে এমএমএক্সের বড় পার্থক্য হলো, এবার মঙ্গলের অত্যন্ত কাছাকাছি গিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরতে হবে। এ ক্ষেত্রে মঙ্গলের প্রবল মহাকর্ষীয় আকর্ষণ অতিক্রম করে ফিরে আসা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে বার্তাসংস্থা এএফপিকে জানান কাওয়াকাতসু।
তিনি বলেন, ‘আমরা যাকে মহাকর্ষীয় কূপ বলি, তার গভীরে প্রবেশ করা কঠিন।’
ফোবোস মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় কক্ষপথে ঘোরে।
মঙ্গলের নমুনা সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের প্রতিযোগিতা
মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে পাথর ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মহাকাশ সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে।
নাসার ‘পারসিভিয়ারেন্স’ রোভার ২০২১ সাল থেকে মঙ্গলে অনুসন্ধান চালাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেছে। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন কংগ্রেসের ভোটের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কার্যত এ নমুনা ফেরত আনার অভিযান বাতিল করে দেয়।
অন্যদিকে চীন জানিয়েছে, তাদের ‘তিয়ানওয়েন-৩’ মহাকাশযান ২০২৮ সালের দিকে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে মঙ্গলের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে দেশটি। সে ক্ষেত্রে এমএমএক্সের নমুনা ফেরত আসার আগেই চীন এ লক্ষ্য অর্জন করতে পারে।
জাক্সার বিজ্ঞানীদের মতে, মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে সংগ্রহ করা বালু ও পাথরের নমুনা গ্রহটির পৃষ্ঠ থেকে সংগৃহীত নমুনার তুলনায় আরো বৈচিত্র্যময় তথ্য দিতে পারে। বিশেষ করে কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সাথে মঙ্গলের সংঘর্ষের ফলে ফোবোস সৃষ্টি হয়ে থাকলে, এ নমুনাগুলো সৌরজগতের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
সূত্র : বাসস
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








