
গণভোটের রায় কার্যকর, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং নাগরিক জীবনের বিভিন্ন সঙ্কট সমাধানের দাবিতে আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত লংমার্চ করবে ১১ দলীয় জোট।
দাবি আদায়ে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে সকাল ১০টায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
বৈঠক শেষে জামায়াতের সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ারের সঞ্চালনায় প্রেস ব্রিফিংয়ে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘গণভোটের গণরায় কার্যকরসহ জনগণের বিভিন্ন দাবি আদায়ে ১১ দলীয় জোট ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম ও রংপুর অভিমুখে দুটি লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় আগামী ৩১ অক্টোবর তৃতীয় লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। ওইদিন সকাল ৭টায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হবে। পরে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে লংমার্চ শেষ হবে।
তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দমন এবং বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করা হবে। বিশেষ করে শরিফ ওসমান হাদি হত্যা, জুলাই গণহত্যা ও শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডসহ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করা হবে।’
লংমার্চে সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, ‘আগের দুটি লংমার্চের মতো এবারো ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা থাকবে বলে তারা আশা করা হচ্ছে।’ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
কর্মসূচিতে বাধা দেয়ার চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, কোনো পক্ষ থেকে লংমার্চকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের দূরভিসন্ধিমূলক অপতৎপরতা চালানো হবে না। এ ধরনের কোনো অপতৎপরতা আমাদের দৃষ্টিতে এলে তা প্রতিহত করেই লংমার্চ সফল করব।’
সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। সহনশীল কর্মসূচি দিয়েছি। কিন্তু সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা গ্রহণের মানসিকতা দেখাচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘জনগণের অধিকার আদায়ে আমরা প্রয়োজনে আরো কঠোর হব। সরকারকে জনগণের মনোভাব ও ইচ্ছা-অভিপ্রায় অনুধাবন করতে হবে। অন্যথায় পরিণাম ভালো হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মামুনুল হক বলেন, ‘নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি না, তা নিয়ে তাদের যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে।’
নির্বাচন কমিশনের সচিব পর্যায়ে দলীয় লোক নিয়োগের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘সরকারের এমন ভূমিকা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।’
ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
মামুনুল হক বলেন, ‘আমরা নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ভূমিকায় দেখতে চাই। এর ব্যত্যয় ঘটলে চুপ করে বসে থাকব না। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার পরিবর্তন না হলে জোটকে কঠোর আন্দোলনের পথে যেতে হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারের মতো বিষয় নিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’
‘একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তি কীভাবে বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারের মতো বক্তব্য দিতে পারেন? আমরা এ বক্তব্যে স্তম্ভিত এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত,’ বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় সফর নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মামুনুল হক। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় সফরে এমন ব্যক্তিদের সফরসঙ্গী করা হয়েছে, যাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব বা প্রটোকলের সাথে সংশ্লিষ্টতা নেই। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরকে বিনোদনমূলক সফরে পরিণত করার মতো আয়োজন করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন উল্লেখ করে সরকারের প্রতি আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় সংসদের আসন্ন চতুর্থ অধিবেশন প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সরকার বিরোধী দলকে কতটা সম্পৃক্ত করবে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে কতটা আন্তরিক হবে, তা নিয়ে তাদের সংশয় রয়েছে।’
তিনি জানান, ‘সংসদ অধিবেশনের আগে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আবারো বৈঠক করা হবে। সেখানে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’
প্রেস ব্রিফিংয়ের প্রশ্নোত্তর পর্বে গোপালগঞ্জের ওপর দিয়ে লংমার্চ যাওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা সম্পর্কে জানতে চাইলে মামুনুল হক বলেন, ‘প্রশাসন যথাযথ দায়িত্ব পালন করলে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা নেই।’
তিনি বলেন, ‘গোপালগঞ্জে ইসলামপন্থী ও দেশপ্রেমিক বিপুল জনগোষ্ঠী রয়েছেন। তারা ব্যাপকভাবে রাজপথে থাকবেন। কোনো ধরনের দূরভিসন্ধিমূলক অপতৎপরতা বা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ হলে তা রাজপথে মোকাবেলা করা হবে।’
গোপালগঞ্জের প্রশাসনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতি তৈরি হলে এর দায় সম্পূর্ণ সরকার ও প্রশাসনকেই বহন করতে হবে।’
লংমার্চের সমাবেশস্থল হিসেবে জেলা স্কুলমাঠের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জায়গাটি তুলনামূলক ছোট এবং প্রবেশপথগুলো সংকীর্ণ হওয়ায় কিছু সমস্যা রয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। দ্রুতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’
গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাথে বৈঠকসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামুনুল হক বলেন, ‘যারা অভিযোগ করছেন, তারা বোধহয় সাথে ছিলেন। তারাই ভালো বলতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্র মেরামতের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছি। মাঠে তামাশা করতে নামিনি। হাজার হাজার শহীদের রক্তের দায় নিয়ে আমরা আন্দোলন করছি। কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের ফাঁদে পা দেব না।’
১১ দলীয় জোটের ঐক্য অটুট থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কার, আধিপত্যবাদ মোকাবেলা এবং ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করার আন্দোলনে তারা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন। আগামী দিনে এই ঐক্যের পরিসর আরো বাড়বে।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগত অংশগ্রহণের বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে বৈঠকে নতুন কোনো আলোচনা হয়নি। আগের অবস্থানই বহাল রয়েছে।’
প্রেস ব্রিফিংয়ে আরো উপস্থিত ছিলেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ড. হামিদুর রহমান আযাদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরানসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








