মুন্সি ফয়েজ আহমেদ, বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক, বিগ বি উদ্যোগ, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক উন্নয়ন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, জাপানের সামরিক সহযোগিতা, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, জাপানি বিনিয়োগ পরিবেশ
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ।

 

Advertisement

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বাংলাদেশের প্রত্যাশাগুলো অর্জিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ। তার মতে, ‘বিগ বি’ উদ্যোগ ও সই হওয়া চুক্তিগুলোতে বাংলাদেশের স্বার্থ যাতে সংরতি হয়, সেদিকে নজর রাখা দরকার। দুই দেশের কোনো উদ্যোগে তৃতীয় কোনো দেশের স্বার্থ ঢুকে পড়লে তা অবশ্যই ভূরাজনৈতিক বিষয় হয়ে যায়। তবে ‘বিগ বি’ নিয়ে জাপানের নেয়া উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দিলে ভারতের সাথে অন্যান্য েেত্র আমাদের ইস্যুগুলো সুরাহা করা সহজ হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক চেয়ারম্যান মুন্সি ফয়েজ আহমেদ আরো বলেন, জাপানের  কাছ থেকে কোনো ধরনের সামরিক সহযোগিতা নিতে গিয়ে আমরা যেন কোনো বলয়ের পে বা বিপে অবস্থান না নিই, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সমুদ্রসীমা নিয়ে চীনের সাথে জাপানের বিরোধ রয়েছে। আমরা যাতে তাতে জড়িয়ে না পড়ি, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত চার দিনের জাপান সফর নিয়ে গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। সফরের সময় বাংলাদেশ ও জাপান ছয়টি নথি স্বার করেছে। এ ছাড়া জাপান দু’টি ঋণ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব উদ্যোগের ল্য উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদার করা, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি ঘটানো এবং দতা উন্নয়ন, কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো েেত্র সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা।
এ সফরে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে জাপানের ‘বিগ বি’ বা ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ উদ্যোগকে ‘অভিন্ন অগ্রগতির জন্য বিগ বি’-তে উন্নীত করা হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।
মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, সফরটি বেশ ভালো হয়েছে। দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এটি প্রথম জাপান সফর। তাই সফর নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। জাপানে শীর্ষ পর্যায়ের সফর হওয়াটাই একটি বড় সাফল্য। পাশাপাশি বেশ কিছু সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তি সই হয়েছে। সফর নিয়ে যা কিছু প্রত্যাশা ছিল, তা অর্জন করা গেছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার আলোচনা ভবিষ্যতে দ্বিপীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতা আরো বাড়াতে কাজে লাগবে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস।
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ‘বিগ বি’ উদ্যোগ প্রসঙ্গে মুন্সি ফয়েজ বলেন, এটি একটি পুরনো উদ্যোগ। সরকার পরিবর্তনের পরও দুই দেশ এটি এগিয়ে নিচ্ছে। এ উদ্যোগ ও সই হওয়া চুক্তিগুলোতে বাংলাদেশের স্বার্থ যেন সংরতি হয়, সে দিকে নজর রাখা দরকার।
‘বিগ বি’র মাধ্যমে ভারতের স্থলবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে কি না এবং এ উদ্যোগের পেছনে ভূরাজনীতি কাজ করছে কি না, জানতে চাইলে সাবেক এ রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের কোনো উদ্যোগে তৃতীয় কোনো দেশের স্বার্থ ঢুকে পড়লে তা অবশ্যই ভূরাজনৈতিক বিষয় হয়ে যায়। তবে সেটা ইতিবাচকভাবে দেখতে হবে। ভবিষ্যতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার হবে না, এটা মনে করার কারণ নেই। ভারত আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী। তাই দেশটির সাথে সম্পর্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতকে সাথে নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। জাপানের ‘বিগ বি’ উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া গেলে তা আমাদের স্বার্থের পরিপন্থী হবে না।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সই এবং বাণিজ্যে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করাসহ ভারতের সাথে অনিষ্পন্ন ইস্যুগুলো সমাধানের বিষয়ে সমঝোতা ‘বিগ বি’ উদ্যোগের সাথে সম্পর্কিত কি না, জানতে চাইলে বিআইআইএসএসের সাবেক এ চেয়ারম্যান বলেন, এটা সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তবে জাপানের নেয়া উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দিলে ভারতের সাথে অন্যান্য েেত্র আমাদের যেসব ইস্যু আছে, তা সুরাহা করা সহজ হবে।
প্রতিরা খাতে জাপানের সহযোগিতার আগ্রহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা আমাদের ভালোভাবে ভেবে দেখতে হবে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চল নিয়ে জাপানের নিজস্ব কৌশল রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আবার যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে কোয়াড গঠিত হয়েছে। এর তৎপরতাকে চীন ভালো চোখে দেখে না। তাই কোনো ধরনের সামরিক সহযোগিতা নিতে গিয়ে আমরা যেন কোনো বলয়ের পে বা বিপে অবস্থান না নিই, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে জাপানের উদ্বেগ প্রসঙ্গে মুন্সি ফয়েজ বলেন, এটা খুবই স্বাভাবিক। প্রথমত, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে আমাদের বিধিবিধান যে অনুকূল, তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেসব খাতে বিনিয়োগ চাই, সেখানে দতা বাড়াতে হবে এবং অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করে তুলতে হবে। তাহলেই বিদেশীরা বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত হবে। এ েেত্র জাপানের মতো বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।
জাতিসঙ্ঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদ (আনকজ) সমুন্নত রাখার বিষয়টি যৌথ বিবৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করা দণি চীন সাগর নিয়ে বিতর্ককে উসকে দেবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এতে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। জাতিসঙ্ঘের এ সনদ আমরা অনুমোদন করেছি। আমরা তা অনুসরণ করব, এটাই স্বাভাবিক। সমুদ্রসীমা নিয়ে চীনের সাথে জাপানের বিরোধ রয়েছে। আমরা যাতে তাতে জড়িয়ে না পড়ি, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।