তারেক রহমানের জাপান সফর, বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক, জাপানি বিনিয়োগ, ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, দুই লাখ কর্মসংস্থান, বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ, টয়োটার মোতোমাচি কারখানা, জাপানে বাংলাদেশের রফতানি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের নাগোয়ায় টয়োটার মোতোমাচি কারখানা পরিদর্শন করেন। এ সময় স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন : পিআইডি।

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে চার দিনের ব্যস্ত ও ফলপ্রসূ রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ রিপোর্ট লেখার সময় ৫ ঘণ্টা বিলম্বে স্থানীয় সময় রাত পৌনে ১১টায় বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সফরের শেষ দিনে গতকাল বৃহস্পতিবারও ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন তারেক রহমান। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতিশীলতা আনবে। তারা বলছেন, সফরে ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিপুল প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশের বেকার যুবসমাজের জন্য প্রায় দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশাপ্রদ বার্তা মিলেছে; যা দেশের অর্থনীতিতে বড়  ধরনের গতিশীলতা আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। 
টয়োটার কারখানা পরিদর্শন ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক : সফরের শেষ দিন গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের নাগোয়া সিটিতে বিশ্বখ্যাত অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টয়োটার প্রধান কারখানা ও সংযোজন প্ল্যান্ট পরিদর্শন করেন। জাপান সফরের অংশ হিসেবে দেশটির নাগোয়ায় অবস্থিত টয়োটার মোতোমাচি কারখানা পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে তিনি এই কারখানা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি কারখানার গাড়ি সংযোজন (অ্যাসেম্বলি) প্রক্রিয়া ঘুরে দেখেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ কথা জানান।
পরিদর্শনকালে টয়োটা মোটর করপোরেশনের দণি এশিয়া অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসাহিকো মোয়েদা, টয়োটা সুশো করপোরেশনের মোবিলিটি বিভাগের সিইও শিগেরু হারাদা এবং প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) শিনিচিরো ওতসুকাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 
কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক শীর্ষ সফর : চার দিনের নিবিড় সফরসূচিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিসহ দেশটির সরকারের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সাথে ধারাবাহিক দ্বিপীয় বৈঠক করেন। পৃথক এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সুযোগ-সুবিধা এবং যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। সফরকালে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরো মজবুত করতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বারিত হয়। 
যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ফাইট বিলম্ব : চার দিনের ব্যস্ত সময় শেষে জাপানের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফাইটে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করার কথা ছিল। জাপানি প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রবাসী বাংলাদেশীরা বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান। তবে বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে স্থানীয় সময় রাত পৌনে ১১টার ফাইট ছেড়ে যায় বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। তিনি বলেন, যান্ত্রিক ত্রুটি দূর হওয়ার পর স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান ছেড়ে যায়। 
প্রবাসী ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া : জাপান প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ববহ, সময়োপযোগী ও বৈপ্লবিক বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রোপটে সরাসরি ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি ও আশ্বাস অর্জন এবং দুই লাখ কর্মসংস্থানের দিগন্ত উন্মোচিত হওয়া বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে। 
জাপানে ৪০ বছর ধরে বসবাস করছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, বিজিএমইএর উপদেষ্টা কাজী সারওয়ার হাবিব। যিনি ১৪ বারের এনআরবি-সিআইপি সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রসঙ্গে বলেনÑ বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপীয় সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বর্তমানে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে জাপান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারক দেশ। যারা প্রতি বছর প্রায় ২৫ বিলিয়ন থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করে। তবে বাংলাদেশ বিশ্বমানের পোশাক তৈরি করলেও জাপানের বাজারে আমরা এখন পর্যন্ত মাত্র ১.৪ বিলিয়ন ডলার রফতানি করতে পেরেছি। 
তিনি আরো বলেন, এ বছর বিজিএমইএতে ‘জাপান ডেস্ক’ ওপেন হয়েছে এবং ৫২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো জাপানি রাষ্ট্রদূত বিজিএমইএ ভিজিট করেছেন। তারা আমাদের কাছ থেকে আগামীতে তিন বিলিয়ন থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের পোশাক কেনার আশা দিয়েছেন। 
কাজী সারওয়ার হাবিব মনে করেন বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বারিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) আওতায় প্রায় সাত হাজার ৩৯৮টি পণ্য বা রফতানি পণ্যের ৯৮ শতাংশই ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা পাচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের রফতানি আয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। 
বিএনপির চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু মনে করেন উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে জাপান সবসময়ই বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্বস্ত বন্ধু। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফরের মাধ্যমে যে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হলো, তার প্রকৃত সুফল পেতে হলে চুক্তি ও আশ্বাসগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে প্রকল্পগুলো সঠিক সময়ে শেষ করার ওপরই এখন মূল সাফল্য নির্ভর করছে। 
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দেন জাপান প্রবাসী ও সফল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার হোসেইন মো: সারোয়ার সানি। যিনি জাপান রেমিট ফাইন্যান্স (জেআরএফ) গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপীয় সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার হলেও জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সঠিক চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে এখনো কিছু ঘাটতি রয়েছে। 
তার মতে, জাপানি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনামে বেশি বিনিয়োগ করেন কারণ সেখানে তাদের প্রচার বা পিআর (পাবলিক রিলেশন) অনেক শক্তিশালী। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বা গ্যাসের কিছু সঙ্কট থাকলেও যেকোনো সমস্যা সমাধান করা মানুষের কাজ। সুতরাং জাপানিদের কাছে বাংলাদেশকে সঠিকভাবে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশীরাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সেতু হিসেবে কাজ করতে পারেন, কারণ প্রবাসীদের প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। 
তিনি আরো বলেন, সরকারের উচিত আরো বেশি ইনভেস্টমেন্ট সেমিনার আয়োজন করা, দূতাবাসগুলোকে আরো সক্রিয় করা এবং জাপানি প্রযুক্তি-বিশেষ করে এআই (এআই) ভিত্তিক প্রযুক্তি ও আধুনিক জ্ঞান বাংলাদেশে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়া। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সে দিকে নজর দেবেন। 
জাপান বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র নেতা মোস্তাফিজুর রহমান জনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা তৈরি ও অর্থনৈতিক গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি। টোকিও সফরে যেসব কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আমাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরো জোরদার হবে।

Advertisement