গুম-খুন বন্ধে সাংবিধানিক সুরক্ষার উদ্যোগ নেবে সরকার

 

Advertisement

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও হেফাজতে মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি বন্ধে সংবিধান ও আইনে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে সেই অভিযোগের তদন্ত না করানো, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর বিষয়গুলো সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। একই সাথে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়েও প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে বিশেষ কমিটি। 
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বৈঠকে বিগত ১৭ বছরে গুম, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি এবং শহীদ পরিবারের প্রতিনিধিরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানান। 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শুনে বৈঠকে উপস্থিত সবাই বেদনা ভারাক্রান্ত হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর দুর্ভোগের পাশাপাশি তাদের সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। 
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, বাংলাদেশ আর কখনো এ রকম সময়ে ফিরে না আসুক। গুমের অপসংস্কৃতি ও অপরাজনীতি চিরতরে বন্ধ হোক। বাংলাদেশে কোনো দিন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হবে না, কেউ গুমের শিকার হবেন না, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হবেন না। পুলিশি বা কারা হেফাজতেও কারো মৃত্যু হবে না- আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই।’ 
গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত বাহিনী তদন্ত করবে না : গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত একই বাহিনী করবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে তদন্তের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা রয়েছে। কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী নিজে ওই অভিযোগের তদন্ত করবে না; অন্য বাহিনী তদন্ত করবে। 
তিনি জানান, বাহিনীর সদস্যদের আচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের ক্ষেত্রে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে। আর ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইন অনুযায়ী বিচার করতে হবে। অপরাধের ধরন বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট আইন অনুসরণ করেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। 
গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে অতীতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অন্যতম দাবি ছিল নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অভিযুক্ত বাহিনীর বাইরে তদন্তের ব্যবস্থা রাখার বিষয়টি সেই দাবির সাথে সম্পর্কিত। তবে তদন্তের স্বাধীনতা, অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতাই শেষ পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগের প্রতিকারে গুরুত্বপূর্ণ হবে। 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগ নেবে। সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন এমন বিষয় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এবং অন্য বিষয়গুলো আইন বা বিধিবিধানের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে। 
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার : বৈঠকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আনিছুর রহমান ও মোছা: তাহসিনা রুশদী (ইলিয়াস আলীর স্ত্রী) তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা নির্যাতন, আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং ন্যায়বিচার পেতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার কথা জানান। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য কার্যকর সাংবিধানিক ও আইনি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেন তারা। তবে জামায়াত দলীয় এমপি মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান এই বৈঠকে আমন্ত্রিত হলেও অংশ নেননি।  
বৈঠক সূত্র জানায়, আলোচনায় গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু গুমের শিকার ব্যক্তিরা এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পাননি। 
দীর্ঘদিন নিখোঁজ ব্যক্তিরা জীবিত নাকি মারা গেছেন- সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় তাদের পরিবারগুলো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। স্বজনের সন্ধান না পাওয়ার বেদনার পাশাপাশি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য আইনগত বিষয়েও তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। 
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দাবির মধ্যে রয়েছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিণতি নির্ধারণ, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন। তাদের বক্তব্যে অতীতের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে গুম প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। 
সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কিছু সমস্যার সমাধানের বিধান রয়েছে। দীর্ঘদিন নিখোঁজ ব্যক্তিদের সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার জন্য আদালতের অনুমতি নেয়ার সুযোগ এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে এসব বিধানের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। 
ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য সঠিক হয়নি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, সরকারের আট মাসের মেয়াদে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ক্রসফায়ার, হেফাজতে মৃত্যু কিংবা গুমের ঘটনা ঘটেনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে এবং স্বাধীন তদন্তের জন্য বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাকেও আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অভিযোগের পক্ষে উল্লেখযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান। 
ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত বক্তব্য দেয়ার কারণে আইজিপি পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগের দিনই তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন এবং আইজিপির মন্তব্যের পর ব্যাখ্যাও দেয়া হয়েছে। আইনের কঠোর প্রয়োগের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হয়তো অসতর্কভাবে শব্দচয়ন করা হয়েছে। 
তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি, এ-জাতীয় শব্দচয়ন করা বা উচ্চারণ করা তার সঠিক হয়নি।’ তবে আইজিপি সরকারের কাছ থেকে ক্রসফায়ার করার নির্দেশনা পেয়েছেন কিংবা নিজে তা করতে চান- এমন কথা বলেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তনের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পক্ষে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।’ 
তবে কী প্রক্রিয়ায় এ সরকার গঠন করা হবে, এর কর্মপরিধি কী হবে এবং কত দিনের মধ্যে গঠন করা হবে- এসব বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান তিনি। সার্চ বোর্ড বা সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের ব্যবস্থা করা হলে তা কিভাবে বিতর্কমুক্ত রাখা যায়, সেটিও বিবেচনায় নেয়া হবে। 
জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে র‌্যাংকড চয়েস ভোটসহ বিভিন্ন বিষয়ে কমিটির অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু প্রস্তাবে তাদের নোট অব ডিসেন্ট ছিল। র‌্যাংকড চয়েস ভোটের মতো বিষয় সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার পক্ষে তারা মত দিয়েছেন। সংবিধান সংশোধন বিল সংসদে উত্থাপনের পর বিতর্কের সময়ও বিভিন্ন প্রস্তাব আসতে পারে বলে জানান তিনি। 
রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা : রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের বিষয়েও বিভিন্ন মহল থেকে প্রস্তাব পেয়েছে বিশেষ কমিটি। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি, শিক্ষক সমাজ ও সম্পাদকদের সাথে বৈঠকে বিভিন্ন পরামর্শ এসেছে। এসব প্রস্তাব একত্র করে কমিটির প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। 
বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলন না করে কমিটিতে এসে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, কমিটিতে বিরোধী দলের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা হলে সেসব প্রস্তাব শোনার সুযোগ থাকত। 
বিশেষ কমিটির নবম বৈঠকে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, তথ্যমন্ত্রী আন্দালিব রহমান, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো: নূরুল হক এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।