
- ৮ শহরে সরবরাহ করা হবে পদ্মা ও মেঘনার পানি
- চার ধরনের পরামর্শকে খরচ ৭৮ কোটি টাকা
- অনুমোদনের আগে ১৪ দফা নির্দেশ পরিকল্পনা কমিশনের
নদী আছে, অথচ নিরাপদ পানির জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। কোথাও পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা উদ্বেগজনক, কোথাও আবার পানির স্তর নেমে গেছে অনেকটা নিচে। দুই হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করে পদ্মা-মেঘনা থেকে পানি টানতে হচ্ছে। আবার পুরনো পাইপলাইনের ফাঁক দিয়ে নষ্ট হচ্ছে অর্ধেকেরও বেশি পানি। দেশের আটটি শহরের ১৮ শতাংশ মানুষ যে পানি ব্যবহার করছে তা নিম্নমানের। সেই সঙ্কট মোকাবেলায় এবার মেঘনা ও পদ্মার পানি তুলে একাধিক শহরে সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ, লাকসাম, কুমিল্লা, ঈশ্বরদী, পাবনা, গোপালপুর ও নাটোর- এই আট শহরের পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৩৮৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত ব্যয়ের একাধিক খাতে কাটছাঁটের পাশাপাশি কুমিল্লার বরুড়া পৌরসভাকে প্রকল্পের আওতায় আনার সিদ্ধান্তও হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের পক্ষ হতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এহতেশামুল রাসেল খান মূল্যায়ন কমিটির সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপনের মাধ্যমে জানান, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হওয়ায় সরকার ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে আসছে। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিবেচ্য ক্লাস্টার টাউন পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। ক্লাস্টার শহরভিত্তিক পানি সরবরাহব্যবস্থার ধারণা হলো ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করা। যেহেতু ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস অপ্রতুল, তাই সহজ প্রাপ্য একটি উৎস থেকে পানি ব্যবহার করে কয়েকটি শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সে পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হলো, মেঘনা নদীর পানি ব্যবহার করে চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ, লাকসাম ও কুমিল্লা শহরে পানি সরবরাহ এবং পদ্মা নদীর পানি ব্যবহার করে ঈশ্বরদী পাবনা, গোপালপুর ও নাটোর পৌরসভার পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ প্রকল্পভুক্ত আটটি শহরের ১৮ শতাংশ মানুষ নিম্নমানের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে।
পানি সরবরাহব্যবস্থায় উল্লিখিত ক্লাস্টার অ্যাপ্রোচ বাস্তবায়িত হলে অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ীমূল্যে টেকসই, জলবায়ু সহিষ্ণু ও নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
প্রকল্পের খরচ হবে ২ হাজার কোটির বেশি
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে। প্রস্তাবিত দুই হাজার ৩৮৭.৩৫ কোটি টাকার মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৫৪৮.৩৫ কোটি এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে প্রকল্প ঋণ হিসেবে এক হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের প্রস্তাবিত বাস্তবায়নকাল ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ, পাঁচ বছরে এই প্রকল্পে সরকারি অর্থের পাশাপাশি বড় অঙ্কের বিদেশী ঋণের উপর নির্ভর করতে হবে। তবে পিইসির সুপারিশের পরও প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হবে।
আর্সেনিক-আয়রনের সমস্যা, নেমে যাচ্ছে স্তর
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি, কয়েকটি অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গুণগত মান ও প্রাপ্যতা- দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা রয়েছে। এ দিকে মূল্যায়ন সভায় ডিপিএইচইয়ের প্রধান প্রকৌশলী জানান, ঈশ্বরদী ক্লাস্টারের ঈশ্বরদী, পাবনা, নাটোর ও গোপালপুর পৌরসভা এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের পরিমাণ অত্যধিক। একই সাথে পানির স্তরও অনেক নিচে নেমে গেছে।
তথ্য থেকে জানা গেছে, কুমিল্লা ক্লাস্টারের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এবং লাকসাম, বরুড়া, চাঁদপুর ও হাজীগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। এই এলাকাগুলিতেও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অত্যন্ত নিচে বলে উল্লেখ করা হয়। আর ডিপিএইচইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদ পানির সঙ্কট রয়েছে। কিন্তু সব অঞ্চলের জন্য একই সমাধান কার্যকর নয়। বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর নেমে যাওয়ার সমস্যার মোকাবেলায় পুকুর ও খাল সংস্কারের উদ্যোগ রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্রকল্প নেয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যয়ে কাটছাঁট, প্রকল্পের ব্যয়ের বিভিন্ন খাত নিয়ে পিইসি সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কার্যবিবরণীর ব্যয়সংক্রান্ত ছক অনুযায়ী, একাধিক খাতে প্রস্তাবিত অর্থের তুলনায় কম ব্যয় সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, নির্মাণ তত্ত্বাবধান ও নকশা পর্যালোচনার জন্য পরামর্শসেবা খাতে প্রস্তাবিত ৪০ কোটি ৪৫ লাখ ৮০ হাজার টাকার পরিবর্তে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা সুপারিশ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে ২৬ কোটি টাকার প্রস্তাব কমিয়ে ২৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। কুমিল্লা ক্লাস্টারের শহরগুলোতে সচেতনতা অভিযানের জন্য এনজিও খাতে ১০ কোটি টাকার পরিবর্তে আট কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ঈশ্বরদী ক্লাস্টারে একই ধরনের কার্যক্রমের জন্য আট কোটি টাকার পরিবর্তে সাত কোটি টাকা সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি খাতে প্রস্তাবিত ৩৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা কমিয়ে ২৭ কোটি ৭০ লাখ ৩০ হাজার টাকা করা হয়েছে। প্রাইস কন্টিনজেন্সির ক্ষেত্রে ২১৮ কোটি ২৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার প্রস্তাব কমিয়ে ১৬৪ কোটি ৬১ লাখ ১১ হাজার টাকা সুপারিশ করা হয়েছে। ছোট ছোট খাতেও ব্যয় কমানোর নির্দেশ রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ৭০ লাখ টাকার পরিবর্তে ২৫ লাখ টাকা, গবেষণায় ৩০ লাখের পরিবর্তে ১০ লাখ টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ভ্রমণে ৩০ লাখের পরিবর্তে ২০ লাখ টাকা সুপারিশ করা হয়েছে। পেট্রল, তেল ও লুব্রিক্যান্ট খাতে ৬০ লাখ টাকার পরিবর্তে ৫০ লাখ টাকা, কম্পিউটার সরঞ্জামে ৫০ লাখের পরিবর্তে ৩০ লাখ টাকা এবং বিজ্ঞাপনে ২০ লাখের পরিবর্তে ১০ লাখ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। অডিও-ভিডিও ও চলচ্চিত্র প্রযোজনা খাতে ২০ লাখ টাকার পরিবর্তে তিন লাখ টাকা এবং শ্রমিক মজুরি খাতে ১৫ লাখ টাকার পরিবর্তে এক লাখ টাকা রাখার কথা বলা হয়েছে।
এডিবির ঋণ, চুক্তি এখনো বাকি
পর্যালোচনা থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের অর্থায়নের ক্ষেত্রেও কিছু প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। সভায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিনিধি জানান, এডিবির ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন ২০২৬ সালের ১৪ থেকে ১৮ জুন প্রকল্পটি নিয়ে কাজ করেছে। মিশনের সাখে আলোচনার ভিত্তিতে এডিবি একটি ‘এইড-মেমোয়ার’ তৈরি করে। তবে ওই নথি নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ আপত্তি জানায়। ইআরডি গত ২০ আগস্ট ২০২৬ সেই আপত্তি এডিবিকে পাঠিয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
অনুমোদনের আগে ১৪ দফা নির্দেশ পরিকল্পনা কমিশনের
জানা গেছে, ভৌত অবকাঠামো বিভাহগ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে। তবে তার আগে ১৪টি সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ প্রতিপালনের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মাস্টার প্ল্যানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন, বরুড়া পৌরসভাকে অন্তর্ভুক্ত করা, ব্যয়ের খাতগুলো পুনর্নির্ধারণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র সংগ্রহ এবং প্রকল্পের ঝুঁকি বিশ্লেষণ। জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে মৌজার নির্ধারিত দরের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত ব্যয় বিভাজন করতে হবে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত পরামর্শকদের কাজের শর্তাবলির সাথে সম্মানী এবং অন্যান্য ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব যুক্ত করতে হবে। প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে কত জন অংশ নেবেন, কোথায় প্রশিক্ষণ হবে এবং কী বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে, তারও বিবরণ দিতে হবে। সব শর্তপূরণ করে প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত নির্দেশিকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে বলা হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








