
ভোটের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন, নির্বাচনী প্রচারে বাধা, হামলা ও হুমকির অভিযোগ। তার মধ্যেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে আন্দোলন আরো তীব্র করার হুঁশিয়ারি দিলো জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। ভোট সুষ্ঠু না হলে রাজপথ আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করলেন জোটের সমন্বয়ক ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, ভোটারদের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে তার দায় নির্বাচন কমিশন ও সরকার- উভয়কেই নিতে হবে। মাগুরার মত নির্বাচন করার কোনো পরিকল্পনা করলে তার পরিণতি ১৯৯৬ সালের মতোই হবে। আযাদের কথায়, মাঠের বাস্তবতার সাথে কমিশনের বক্তব্যের মিল না থাকলে সেই আশ্বাসকে তারা ‘আইওয়াশ’ বলে মনে করবেন।
আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সাথে বৈঠক শেষে এই জোট নেতা এ মন্তব্য করেন। জোটের পক্ষ থেকে ইসিতে লিখিতভাবে অভিযোগ ও দাবি জানানো হয়। এ সময় চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিব উপস্থিত ছিলেন। আর জোটের প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তাফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব:) আবদুল বাতেন, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, জাগপার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল মিয়াজী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির ইঞ্জিনিয়ার শহিদুল আলম এবং খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা মুফতি ফখরুল ইসলামসহ জোটের নেতারা ছিলেন।
নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠক শেষে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচনে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাদের আন্দোলন আরো তীব্র হতে পারে। তবে তারা এমন পরিস্থিতি চান না। সরকারের উচিত, পরিস্থিতি যাতে সেই দিকে না গড়ায়, তা নিশ্চিত করা। তিনি জানান, গণভোটের রায় বাস্তবায়িত হয়নি বলে সাত দফাসহ বিভিন্ন দাবিতে তাদের আন্দোলন চলছে। আগামী ৩১ অক্টোবর লং মার্চের কর্মসূচিও রয়েছে। ১১ দলীয় জোট আন্দোলনের মাঠে রয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির অবনতি হলে আন্দোলন আরো জোরদার করা হতে পারে।
হামলা-হুমকির অভিযোগ, নিরাপত্তার দাবি
ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনী প্রচারে বাধা, হামলা ও সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন ঘটনার তথ্য নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হয়েছে। কে কাকে আঘাত করেছেন, কখন, কোন দিন, কোন রাতে এবং কোথায় ঘটনা ঘটেছে- সব তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলাকারীদের নাম ও আহত ব্যক্তিদের তালিকাও লিখিতভাবে জমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা তারা এখনো জানতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে ভোটারদের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশেষ করে হিন্দু ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন আযাদ। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রায় এক লাখ ৬৮ হাজার হিন্দু ভোটার রয়েছেন। তাদের হুমকি দেয়া ও মারধরের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রত্যেক ভোটার যাতে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। আযাদ বলেন, সংবিধানের সপ্তম ভাগের ১১৮ থেকে ১২৬ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে। সেই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে কমিশনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কমিশন নিজেকে স্বাধীন ও শক্তিশালী বলে দাবি করলেও বাস্তবে তার প্রমাণ দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
৪ দাবির প্রথমেই সেনা মোতায়েন
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের কাছে চারটি প্রধান দাবি জানিয়েছে ১১ দলীয় জোট। প্রথম দাবি, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। ড. আযাদ জানান, কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য রয়েছেন। পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু অতীতের ভূমিকা এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এসব বাহিনীর ওপর তাদের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। তার দাবি, সাধারণ মানুষের মধ্যে সেনাবাহিনীর প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি আস্থা রয়েছে। সেনাবাহিনী মাঠে থাকলে ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে যেতে পারবেন এবং নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
ইউএনও খায়রুল ইসলামকে প্রত্যাহার
দ্বিতীয় দাবি, সদর উপজেলার ইউএনও খায়রুল ইসলামকে নির্বাচনের আগেই প্রত্যাহার করতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
তৃতীয় দাবি হলো, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আযাদ বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কমিশন সিভিল সার্জনকে শোকজ করেছে। নির্বাচনের সময় ইউনিয়নভিত্তিক ক্যাম্প স্থাপনের বিষয়টি আচরণবিধি লঙ্ঘন কি না, তা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। এ ছাড়া বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত এবং পাল্টা অভিযোগের বিষয়েও যথাযথ পদক্ষেপ চেয়েছেন তারা।
তিনটি পর্যায় পর্যবেক্ষণে সিসি ক্যামেরার দাবি
চতুর্থ দাবি, ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ- এই তিনটি পর্যায় সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো অনিয়ম দেখা গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। আযাদ জানান, কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে একটি মনিটরিং সেল গঠনের কথা জানিয়েছে। তবে শুধু মনিটরিং সেল তৈরি করলেই হবে না। ভোটের দিন মাঠপর্যায়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
কমিশনের স্বাধীনতার পরীক্ষা
হামিদুর রহমান আযাদের মতে, ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা যাচাইয়ের পরীক্ষা। অতীতের খারাপ নির্বাচনী সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সুষ্ঠু ভোটের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে, তা বাস্তবে প্রমাণ করতে হবে। তিনি বলেন, ভোটারদের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে কমিশন ব্যর্থ হলে তার প্রভাব শুধু একটি আসনের নির্বাচনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সরকার ও নির্বাচন কমিশন- উভয়কেই এর রাজনৈতিক পরিণতি বিবেচনায় নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনের কথা তুলে ধরেন আযাদ। তার বক্তব্য, ওই নির্বাচনের সূত্র ধরে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের পতন হয়েছিল। পরবর্তী নির্বাচনেও বিএনপি ক্ষমতায় ফিরতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই উদাহরণ টেনে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার ও কমিশনকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
ভোটে থাকবেন কি না, সিদ্ধান্ত ভোটের দিন
নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ থাকলেও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে তাদের প্রার্থী থাকবেন কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি ১১ দলীয় জোট। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আযাদ বলেন, তারা নির্বাচন করার জন্যই প্রার্থী দিয়েছেন। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রার্থী দেয়া হয়নি। তবে ভোটের দিনও পরিস্থিতি খারাপ থাকলে তখন সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
তার কথায়, আমরা তো ইলেকশন করার জন্য প্রার্থী দিয়েছি। ইলেকশন না থাকার জন্য প্রার্থী দিইনি। পরিস্থিতি যদি ভোটের দিনও সেই পর্যায়ে যায়, তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার সমালোচনা করেন আযাদ। তার দাবি, কমিশন প্রথমে একটি রোডম্যাপ দিলেও পরে একজন মন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তা পরিবর্তন করা হয়েছে। কমিশন এ বিষয়ে নিজেদের ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিন্তু তাদের মতে, মন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কারণেই রোডম্যাপে পরিবর্তন এসেছে।
আযাদ বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনের পরিস্থিতি দেখেই বোঝা যাবে, ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। নির্বাচন যাতে সরকারের প্রভাবমুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় কমিশন তাদের কাছে পরামর্শ চেয়েছে। তারা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচন কবে হবে, তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কমিশন নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








