
বিশেষ সংবাদদাতা
দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের ওঠানামার আড়ালে গভীরতর কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র ফুটে উঠছে। লেনদেনের সঙ্কোচন, বাজারের তারল্য হ্রাস, তালিকাভুক্ত কোম্পানির বাজারমূল্য কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান- সব মিলিয়ে বাজার এখনো টেকসই পুনরুদ্ধারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার উদ্যোগ, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার এবং সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন বিধিমালা বাজারে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গতকাল প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পুঁজিবাজারবিষয়ক মাসিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ০.৮৫ শতাংশ কমে পাঁচ হাজার ৫৫০.৪৪ পয়েন্টে দাঁড়ায়। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক ক্যাসপি কমে ১৪ হাজার ৮১৪.৬৯ পয়েন্টে। একই সময়ে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ আগের মাসের তুলনায় ১৮.২৩ শতাংশ কমে ১৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা এবং সিএসইতে ১৭.৩৯ শতাংশ কমে ৫৫১ কোটি টাকায় নেমে আসে।
অক্টোবরের সর্বশেষ বাজারচিত্রেও অস্থিরতার ইঙ্গিত রয়েছে। ডিএসইর ওয়েবসাইটে ২৮ অক্টোবরের প্রকাশিত বাজার তথ্যে প্রধান সূচক পাঁচ হাজার ৪৩৩.২৭ পয়েন্ট এবং লেনদেন ৪৪ হাজার ৯৫ কোটি টাকা দেখানো হয়। আগের দিন, ২৭ অক্টোবর, সূচক কমে পাঁচ হাজার ৩৮৬.৫৪ পয়েন্টে এবং লেনদেন ৪৩ হাজার ৫০ কোটি টাকায় ছিল। অর্থাৎ সর্বশেষ তথ্যে সূচকে পুনরুদ্ধারের আভাস মিললেও এক দিনের উত্থানকে স্থায়ী প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সূচকের চেয়ে বড় উদ্বেগ লেনদেনের সঙ্কোচন
পুঁজিবাজারের স্বাস্থ্য বোঝার জন্য সূচক গুরুত্বপূর্ণ হলেও লেনদেনের পরিমাণ ও বাজারের তারল্য আরো তাৎপর্যপূর্ণ। সূচক বাড়তে পারে সীমিতসংখ্যক বড় মূলধনি শেয়ারের দাম বৃদ্ধির কারণে; কিন্তু বাজারজুড়ে ব্যাপক অংশগ্রহণ না থাকলে সেই উত্থান টেকসই হওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ২০২৬ সালের জুনে ছিল ২৬ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা এবং জুলাইয়ে ২৬ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। আগস্টে তা কমে ১৭ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ১৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাসিক লেনদেন প্রায় ৪৬ শতাংশ কমেছে।
এটি বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের দুর্বলতা এবং নতুন অর্থ প্রবেশের সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়। তবে লেনদেন কমার অর্থ এই নয় যে সমপরিমাণ অর্থ বাজার থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে গেছে। শেয়ার কেনাবেচার গতি কমা, বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষমাণ অবস্থান এবং তারল্যের সীমাবদ্ধতাও এর কারণ হতে পারে।
লেনদেনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো টার্নওভার ভেলোসিটি রেশিও (টিভিআর)। ডিএসইতে এ অনুপাত আগস্টের ৩০.২৭ শতাংশ থেকে সেপ্টেম্বরে ২৫.০১ শতাংশে নেমেছে। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, এটি ছিল ৩১.৮২ শতাংশ। বাজারের আকারের তুলনায় লেনদেন কতটা হচ্ছে, তার একটি ধারণা দেয় এই সূচক। এর পতন বাজারে শেয়ার হাতবদলের গতি কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে।
বাজার মূলধন কমছে, অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের ভূমিকা সীমিত
সেপ্টেম্বর শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়ায় ছয় লাখ ৮৭ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। আগস্টের তুলনায় এটি ১.০৫ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় ৫.১৮ শতাংশ কম। একই সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত ১১.২৩ শতাংশে নেমেছে, যা আগস্টে ছিল ১১.৩৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ১১.৮৫ শতাংশ।
বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত কমে যাওয়া অর্থনীতির তুলনায় শেয়ারবাজারের আকার ও গুরুত্ব সীমিত থাকার ইঙ্গিত দেয়। এর অর্থ, শিল্পায়ন, নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য শেয়ারবাজারকে অর্থায়নের শক্তিশালী উৎস হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বাজার মূলধন কমে যাওয়া মানেই কোম্পানিগুলোর উৎপাদন, সম্পদ বা আয় একই অনুপাতে কমে যাওয়া নয়। শেয়ারের বাজারদর কমলেও মূলধন কমে যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে বাজারমূল্য ও লেনদেনের দুর্বলতা বজায় থাকলে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং বিদ্যমান কোম্পানির শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ নিরুৎসাহিত হতে পারে।
অন্য দিকে সিএসইর বাজার মূলধন সেপ্টেম্বরে ০.১৮ শতাংশ বেড়ে ৯ লাখ ৫২ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ক্যাসপি সূচক ১.৬৯ শতাংশ কমেছে। দুই সূচকের এই বিপরীতমুখী প্রবণতা দেখায় যে বাজার মূলধনের পরিবর্তন ও শেয়ারের সামগ্রিক মূল্যগত গতিপ্রকৃতি সব সময় এক রকম হয় না। দুই স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধনের হিসাবের আওতাতেও পার্থক্য রয়েছে।
কম পিই অনুপাত কি বিনিয়োগের সুযোগ, নাকি ঝুঁকির সঙ্কেত?
সেপ্টেম্বর শেষে ডিএসইর সব তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও ৮.৮২-তে নেমেছে, যা আগস্টে ছিল ৮.৮৯ এবং এক বছর আগে ছিল ১০.৩৮। একই সময়ে ডিএসইর ইয়েল্ড ৪.৬৯ শতাংশে উঠেছে, আগস্টে যা ছিল ৪.৬৪ শতাংশ।
কম পিই রেশিও সাধারণভাবে শেয়ারের দাম তুলনামূলক কম হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু বাজারের সব শেয়ারকে একইভাবে মূল্যায়ন করা যায় না। কোনো কোম্পানির আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, অনিয়মিত লভ্যাংশ বা আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর আস্থার অভাব থাকলে কম পিই রেশিও সত্ত্বেও শেয়ারটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
অতএব, বাজারের সামগ্রিক পিই অনুপাত কমেছে বলে সব শেয়ার অবমূল্যায়িত- এমন সিদ্ধান্ত সঠিক হবে না। বরং কোম্পানিভিত্তিক আয়, নগদ প্রবাহ, ঋণের বোঝা, লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা এবং নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী যাচাই করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি।
লেনদেনে কয়েকটি খাতের প্রাধান্য
সেপ্টেম্বরে ডিএসইর মোট লেনদেনে বস্ত্র খাতের অংশ ছিল ২৫.৭০ শতাংশ। এরপর ছিল বিমা খাত ১৭.৫৭ শতাংশ, ওষুধ ও রসায়ন ১১.৫৫ শতাংশ এবং ব্যাংক ৯.১৬ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র চারটি খাত মোট লেনদেনের প্রায় ৬৪ শতাংশ জুড়ে ছিল।
এই কেন্দ্রীভূত প্রবণতা বাজারে খাতভিত্তিক আগ্রহের ইঙ্গিত দিলেও একে অর্থনীতির সব খাতে সমানভাবে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের প্রমাণ বলা যায় না। লেনদেনের বড় অংশ কয়েকটি খাতে সীমাবদ্ধ থাকলে সংশ্লিষ্ট খাতের দরপতন বা নেতিবাচক সংবাদ পুরো বাজারের ওপর বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া লেনদেনে কোনো খাতের অংশ বেশি হওয়া আর সেই খাতের কোম্পানিগুলো মৌলভিত্তিতে শক্তিশালী হওয়া এক বিষয় নয়। শেয়ারের প্রকৃত মূল্য, আয়, ঋণ, নগদ প্রবাহ এবং করপোরেট সুশাসনের মান যাচাই করেই খাতভিত্তিক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।
সংস্কারে নতুন উদ্যোগ, বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে স্বচ্ছতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান ৪ অক্টোবর বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নিয়ন্ত্রক সংস্কার, ডিজিটাল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর ওপর গুরুত্ব দেন। কমিশনের পক্ষ থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারকে বাজার সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
১৮ অক্টোবর বিএসইসি সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য নতুন বিধিমালা প্রকাশ করেছে। ১৯ অক্টোবর কমিশন পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ বিধিমালার খসড়া সংশোধনী নিয়েও মতামত আহ্বান করে। নতুন সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে যোগ্য কোম্পানির বাজারে প্রবেশের পথ প্রসারিত হতে পারে। তবে নতুন বিধিমালা প্রকাশ এবং তার মাধ্যমে বাস্তবে মানসম্পন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়া এক বিষয় নয়।
বাজারে নতুন কোম্পানি আনার পাশাপাশি বিদ্যমান কোম্পানিগুলোর আর্থিক তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, নিরীক্ষার মান, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় তালিকাভুক্তির সুযোগ বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে না।
আস্থা ফেরাতে নজরদারি ও জবাবদিহি জরুরি
একটি কার্যকর পুঁজিবাজারের জন্য শুধু নতুন নিয়ম বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। বাজার কারসাজি, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, গুজবনির্ভর লেনদেন এবং আর্থিক তথ্য গোপনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সাথে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে কখনো অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, কখনো আকস্মিক নীতিবদল বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি মূল্যায়ন কঠিন করে তুলতে পারে। তাই নিয়মের স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছ প্রয়োগ এবং বাজারসংশ্লিষ্টদের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে সংস্কার এগিয়ে নেয়া প্রয়োজন।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর, ভালো কোম্পানির আইপিও উৎসাহিত করা এবং বন্ডবাজারের বিকাশও গুরুত্বপূর্ণ। এতে শেয়ারবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে এবং শিল্প ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি হবে।
সামনে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ
আগামী দিনে পুঁজিবাজারের পুনরুদ্ধার মূল্যায়নে অন্তত পাঁচটি বিষয় নজরে রাখা প্রয়োজন : মাসিক লেনদেনের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, বাজারের তারল্য ও টিভিআরের উন্নতি, মানসম্পন্ন কোম্পানির নতুন তালিকাভুক্তি, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের আয় ও লভ্যাংশের স্থিতিশীলতা এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের কার্যকারিতা।
২৮ অক্টোবর ডিএসইর সূচকে উত্থান কিছুটা ইতিবাচক সঙ্কেত দিলেও তা এককভাবে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটার প্রমাণ নয়। সেপ্টেম্বরের তথ্য যে তারল্যসঙ্কোচন ও বাজারমূল্য হ্রাসের চিত্র তুলে ধরেছে, তার বিপরীতে টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য ধারাবাহিক লেনদেন, ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার উন্নতি প্রয়োজন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








