ব্যাংকগুলোর ডলার রাখার সীমা বাড়ছে

আশরাফুল ইসলাম

Advertisement

ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা নিজেদের কাছে ধরে রাখার সীমা (নেট ওপেন পজিশন-এনওপি)  বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বড় অঙ্কের পণ্য আমদানির দায় পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে, এতে ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগাম ডলার কিনে রাখার ফলে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকিও বাড়তে পারে। পাশাপাশি ডলার মজুদও বেড়ে যেতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রায় স্থিতিশীলতা থেকে অস্থিতিশীল হতে পারে। সম্ভাব্য এ পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। 
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত বাজারে যখন বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায় তখন ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখার সীমা বা এনওপি বাড়ানো হয়। আবার যখন বাজারে ডলার সঙ্কট থাকে তখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর এনওপি কমিয়ে দেয়া হয়। বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সময়ে সময়ে এমন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। তবে, এনওপি বাড়ানোর সবচেয়ে বেশি অসুবিধা হলো সঙ্কটের সময় ব্যাংকগুলো প্রয়োজনের উদ্বৃত্ত ডলার বাজারে বিক্রি না করে নিজেদের কাছে ধরে রাখে। এতে কৃত্রিম সঙ্কট দেখা দেয়। এ সঙ্কটের কারণে বাজারে ডলারের দাম বেড়ে  যায়। তবে, ব্যাংকগুলোর জন্য সুবিধার হলো, বড় আমদানির দায় পরিশোধের জন্য আগাম ডলার ধরে রাখতে পারে। এতেও ঝুঁকি রয়েছে- আর তা হলো বিনিময় ঝুঁকি। যেমন, বাজারে চাহিদা থাকার কারণে কোনো ব্যাংক প্রতি ডলার ১২৫ টাকা দরে ৫০ কোটি ডলার ভবিষ্যৎ আমদানি দায় মেটানোর জন্য কিনে রাখা হলো। কিন্তু চাহিদা কম থাকার কারণে বা বেশি পরিমাণ রেমিট্যান্স আসার কারণে পরের সপ্তাহে প্রতি ডলারের মূল্য ২ টাকা কমে ১২৩ টাকা হলো। প্রতি ডলার ২ টাকা কমে যাওয়ায় ১০০ কোটি টাকার লোকসান হলো। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংকসহ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের এনওপি সীমা বাড়ানো হয়েছে। একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে আগের ৩৯ মিলিয়ন ডলারের সীমা বাড়িয়ে ৮০ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে। অন্য দিকে, ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল) তাদের সীমা ৪০ মিলিয়ন থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার আবেদন জানিয়েছে। সিটি ব্যাংকও তাদের এনওপি সীমা আগের ৭৩ মিলিয়ন ডলারে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে। ব্যাংকটির সীমা এর আগে কমিয়ে ৪৩ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছিল।
প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী, নেট ওপেন পজিশন হলো- একটি ব্যাংক দিন শেষে নিজের কাছে কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখতে পারবে তার পরিমাণ।  বৈদেশিক মুদ্রায় একটি ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ের মধ্যকার নিট অবস্থান, যা বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে ব্যাংকটির সম্ভাব্য লাভ বা ক্ষতির ঝুঁঁকি নির্দেশ করে। ২০২২ সালের জুলাইয়ের আগে ব্যাংকগুলো তাদের নিয়ামক মূলধনের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত এনওপি রাখতে পারত। কিন্তু ডলার সঙ্কট তীব্র হয়ে ওঠার পর বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যবস্থায় কঠোরতা আরোপ করে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে সীমা বাড়ানোর ফলে যেসব ব্যাংক বড় সরকারি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করে, তারা নির্ধারিত পেমেন্টের অনেক আগে থেকেই ধাপে ধাপে ডলার কিনে রাখতে পারবে। এতে পেমেন্টের শেষ মুহূর্তে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার কেনার প্রয়োজন কমবে এবং আকস্মিক চাহিদার কারণে বিনিময় হারে চাপ সৃষ্টির আশঙ্কাও হ্রাস পেতে পারে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলার মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় এলসি পেমেন্ট সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ে বিপুল পরিমাণ ডলার সংগ্রহ করতে হয়। এনওপি সীমা সঙ্কুচিত থাকলে ব্যাংকগুলো বড় পেমেন্টের আগে প্রয়োজনীয় ডলার সংগ্রহে বাধার মুখে পড়তে পারে। একাধিক ব্যাংক একই সময়ে বাজার থেকে ডলার কিনতে শুরু করলে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাহিদা বেড়ে যায়। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে ডলারের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একজন ব্যাংকার জানিয়েছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি এলসির বড় অঙ্কের পেমেন্টের কারণে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। এনওপি সীমা বেশি থাকলে ব্যাংকগুলো আগেভাগে ডলার সংগ্রহ করে রাখতে পারবে, যা পেমেন্টের দিন বিনিময় হারে আকস্মিক উল্লম্ফন ঠেকাতে সহায়তা করবে। সামনে রমজানকে কেন্দ্র করে ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা আমদানি ব্যয় বাড়াতে পারে। এ পরিস্থিতিতে এনওপি সীমা বৃদ্ধি ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত নমনীয়তা এনে দিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নীতিনির্ধারক জানিয়েছেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দিয়ে প্রায় ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি এনওপি সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তে সহায়ক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এনওপি সীমা বাড়ানোর সুবিধার পাশাপাশি কিছু ঝুঁঁকিও রয়েছে। ব্যাংকগুলো ভবিষ্যতে ডলারের দাম বাড়বে- এমন প্রত্যাশায় বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখতে পারে। একাধিক ব্যাংক একই কৌশল অনুসরণ করলে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের সরবরাহ কমে গিয়ে অন্য ব্যাংকগুলোর জন্য সঙ্কট আরো বাড়তে পারে।
এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমলে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখা ব্যাংক লাভবান হতে পারে, কিন্তু টাকার মূল্য বাড়লে তাদের লোকসানও হতে পারে। ফলে এনওপি সীমা ব্যবস্থাপনায় ঝুঁঁকি মূল্যায়ন ও কার্যকর তদারকি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে এনওপি সীমা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণে কয়েকটি ব্যাংক আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রিতে অনীহা দেখিয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতি আবার তৈরি হলে বাজারের স্বাভাবিক লেনদেন ব্যাহত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এনওপি সীমা বৃদ্ধির উদ্যোগ বড় আমদানি দায় পরিশোধ সহজ করা, ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং ডলারের আকস্মিক চাহিদা কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কেবল সীমা বাড়ালেই বাজারে নতুন ডলার তৈরি হবে না। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ, আমদানি দায়ের পরিমাণ এবং বাজারে ডলারের সামগ্রিক প্রাপ্যতার ওপর। তাই এ নীতিগত শিথিলতার সুফল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে ধারাবাহিক নীতি বজায় রাখার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ধারণ ও লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সঠিক তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এনওপি সীমা বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বড় আমদানি পেমেন্টের চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে কার্যকর সহায়ক হতে পারে।