
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
‘শুধু ওনাদের পক্ষে দাঁড়ালে হবে না। আপনার (মুনসুরুল হক চৌধুরী) ওনাদের শিক্ষাও দিতে হবে, যেন আদালতের রীতিনীতি বোঝেন এবং আপনাদের মতো হতে পারেন।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর এজলাসে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরীকে উদ্দেশ করে কথাগুলো বলেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। এ সময় বিচারিক প্যানেলে তার সাথে ছিলেন সদস্য বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আদালত অবমাননার অভিযোগে তলব করা দুই আইনজীবীর পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছিলেন মুনসুরুল হক। একপর্যায়ে তাকে থামিয়ে এ মন্তব্য করেন চেয়ারম্যান।
গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে ট্রাইব্যুনাল-২-এ এ ঘটনা ঘটে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্য করার অভিযোগে হাজির হয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী হাসানুজ্জামান তুষার ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী।
শুনানিতে দুই আইনজীবীর পক্ষে দাঁড়িয়ে মুনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, আবেগের বশবর্তী হয়ে মানুষ অনেক সময় অনেক কথা বলে ফেলেন। তার দুই মক্কেলও আবেগের বশে এমন মন্তব্য করেছেন। তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। অনুতপ্ত হয়েছেন। এখন ক্ষমা চাইতে চান। তখন ট্রাইব্যুনাল দুই আইনজীবী কত বছর ধরে আইন পেশায় আছেন, তা জানতে চান। মুনসুরুল হক জানান, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী ২০১৪ সাল থেকে এবং হাসানুজ্জামান তুষার ২০০৪ সাল থেকে আইন পেশায় নিয়োজিত। এরপর ট্রাইব্যুনাল জানতে চান, তারা আইন ভালো করে জানেন কিনা নাকি এমনিতেই মন্তব্য করে বসেছেন।
শুনানিতে আদালতের সমালোচনা ও বিচারকদের নিয়ে মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ট্রাইব্যুনাল বলেন, বিচারকদের বিচার করা বা তাদের কাজের মূল্যায়ন করার বিষয়টি সব সময় মাথায় রাখতে হয়। যেকোনো বিষয়ে সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে। তবে সমালোচনারও শিষ্টাচার রয়েছে। সেটি বজায় রাখতে হবে।
এ সময় আইনজীবীদের পেশাগত আচরণ ও বিনয়ের ওপর গুরুত্ব দেন চেয়ারম্যান। বার কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার শওকত আলী খানের একটি বক্তব্যও তুলে ধরেন তিনি। চেয়ারম্যান বলেন, শওকত আলী খান বারের সভাপতি থাকাকালে নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশে প্রায়ই বলতেন, ‘আমি কিভাবে আরো বিনয়ী হতে পারি?’
মুনসুরুল হক চৌধুরীকেও তার দুই মক্কেলকে বিষয়টি বোঝানোর পরামর্শ দেন চেয়ারম্যান। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, অভিযুক্তদের পক্ষে আইনি লড়াই চালানোর পাশাপাশি তাদের আদালতের রীতিনীতি ও শিষ্টাচার সম্পর্কেও সচেতন করা প্রয়োজন। শুনানির সময় দুই আইনজীবীই এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী বলেন, তারা অনুতপ্ত। নিজেদের মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইছেন।
মুনসুরুল হক চৌধুরী জানান, তার দুই মক্কেল ফেসবুকে দেয়া পোস্ট মুছে ফেলেছেন। তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। লিখিতভাবে বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে সময় চান। চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলামও সময় দেয়ার পক্ষে মত দেন। পরে ট্রাইব্যুনাল লিখিত বক্তব্য দেয়ার জন্য সময় মঞ্জুর করেন। এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ওই রায় নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্য করেন হাসানুজ্জামান তুষার ও মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী। হাসানুজ্জামান তুষার তার পোস্টে ট্রাইব্যুনালকে
‘অবৈধ ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ উল্লেখ করে রায়কে ‘মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেন। অন্য দিকে ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী তার পোস্টে ট্রাইব্যুনালের রায়কে ‘অবৈধ’ ও ‘ফরমায়েশি’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তিনি ওই রায় প্রত্যাখ্যান করার কথাও লেখেন।
এসব মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন দুই আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনে। তাদের সশরীরে হাজির হয়ে মন্তব্যের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়।
এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে শুনানির জন্য সময় চান মুনসুরুল হক চৌধুরী। মামলাটি ট্রাইব্যুনালের পূর্ণ বেঞ্চে শুনানিরও আবেদন জানান তিনি। পরে সোমবার শুনানির দিন ধার্য করা হয়। সোমবারের শুনানিতে দুই আইনজীবী ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং লিখিত বক্তব্য দেয়ার জন্য সময় চান। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








