রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বেসরকারি থেকে এমডি

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

Advertisement

রাষ্ট্রায়ত্ত চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। নজিরবিহীনভাবে এবারই প্রথমবারের মতো দু’টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ পৃথক চারটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ এবং পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার বিষয়ে নির্দেশনা জারি করেছে। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব আফরোজা আক্তার রিবা স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনগুলোর মাধ্যমে গতকাল এ-সংক্রান্ত তথ্য জানা গেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল রাতে বলেন, চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে একসাথে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারের ব্যাংকিং খাত সংস্কারে নেতৃত্ব পরিবর্তনকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। তবে এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। নতুন এমডিরা পূর্ণ  পেশাগত স্বাধীনতা পান কি না, তাদের সাথে লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসম্পাদন চুক্তি করা হয় কি না, পরিচালনা পর্ষদ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে কি না এবং কর্মসম্পাদনের মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয় কি না- এসব বিষয়ই হবে সাফল্যের নির্ধারক। তিন বছরের চুক্তির মেয়াদে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের সূচকে দৃশ্যমান উন্নতি হলে এ উদ্যোগকে সফল বলা যাবে।
কোন ব্যাংকে কারা এলেন
জনতা ব্যাংক পিএলসি : বেসরকারি খাতের সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চিফ রিস্ক অফিসার মো: মাহবুব আলমকে তিন বছরের জন্য জনতা ব্যাংকের এমডি ও সিইও পদে নিয়োগের সম্মতি দিয়েছে সরকার। এর আগে জনতা ব্যাংকের এমডি ছিলেন মুজিবুর রহমান। অন্তর্বর্তী সরকার তাকে নিয়োগ দিয়েছিল। গত সপ্তাহে তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি। অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগসহ বিভিন্ন কারণে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি : বেসরকারি খাতের যমুনা ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর মোহাম্মদকে তিন বছরের জন্য অগ্রণী ব্যাংকের এমডি ও সিইও পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
বেসিক ব্যাংক পিএলসি : রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: নুরুল হুদাকে যোগদানের তারিখ থেকে তিন বছরের জন্য বেসিক ব্যাংকের এমডি ও সিইও পদে নিয়োগের সম্মতি দেয়া হয়েছে।
সোনালী ব্যাংক পিএলসি : সোনালী ব্যাংকের এমডি ও সিইও মো: শওকত আলী খানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের পূর্ববর্তী আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে পদে বহাল রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে ১৯ অক্টোবর জারি করা স্মারকের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়।
একই সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে ‘ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১’ অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে সংস্কারের উদ্যোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, অতীতে সাধারণত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পদে নিজস্ব কর্মকর্তাদের পদোন্নতি কিংবা এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে পদায়নের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হতো। বেসরকারি খাত থেকে সরাসরি অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের এনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্বে বসানোর সিদ্ধান্ত সেই প্রচলিত ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
বেসরকারি ব্যাংকগুলো সাধারণত পেশাদারত্ব, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উদ্ভাবনী সেবা এবং কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সাউথইস্ট ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্বে আনার মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের মতো বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার দুর্বলতা এবং সুশাসনের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ। বেসরকারি খাতের আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও পেশাগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং সুশাসন নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।
সরকারি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের পেশাদারত্বের সমন্বয় ঘটানো গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও বেসরকারি ব্যাংকের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তবে এ পরিবর্তনের সুফল পেতে হলে শুধু নেতৃত্ব বদল নয়, ব্যাংকগুলোর পরিচালনা কাঠামো, ঋণ বিতরণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রেও কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
নিয়োগ ও বাতিলের সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন
উল্লেখ্য, গত সেপ্টেম্বরে সরকার অগ্রণী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) ও বেসিক ব্যাংকের এমডিদের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে। পরে ১৯ অক্টোবর একই পথে সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের এমডিদের চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সোনালী ব্যাংকের এমডি ২০২৪ সালের অক্টোবরে তিন বছরের চুক্তিতে যোগ দিয়েছিলেন; কিন্তু নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়ার মাত্র সাত দিনের মধ্যে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। সর্বশেষ আদেশে বাতিলের পূর্ববর্তী নির্দেশনা প্রত্যাহার করায় তিনি আবারো পদে বহাল থাকছেন। এর আগে জারি করা সরকারি চিঠিতে চুক্তি বাতিলের কারণ উল্লেখ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ দিকে এমডি নিয়োগের যোগ্যতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে এমডি পদে থাকার পর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত প্রযোজ্য ছিল, যা এখন শিথিল করা হয়েছে। তবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত বহাল রয়েছে। এ শর্ত শিথিল না করা হলে বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া কঠিন হতো। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, এমডি পদে উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজতে বেসরকারি ব্যাংক খাতের কর্মকর্তাদেরও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছিল।
অভ্যন্তরীণ পদোন্নতি ও পেশাগত স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর আশঙ্কা, সরকারের এ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির কাঠামোয় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রচলিত ব্যবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদকে সাধারণত অভ্যন্তরীণভাবে পদোন্নতি পাওয়া উপব্যবস্থাপনা পরিচালকদের স্বাভাবিক গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বাইরে থেকে সরাসরি নিয়োগ দেয়ায় এ ধারায় পরিবর্তন আসবে। এতে অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এক কর্মকর্তা গতকাল এ প্রতিবেদককে বলেন, বেসরকারি ব্যাংক থেকে অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নিয়োগ দিলেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জটিল ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সাথে তাদের খাপ খাইয়ে নেয়া সহজ হবে না। রাজনৈতিক চাপ, কর্মচারী ইউনিয়নের ভূমিকা এবং সরকারি ক্রয়বিধির মতো বিষয়গুলো সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমডি নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকায় প্রার্থী নির্বাচনের মানদণ্ড, যোগ্যতা যাচাই এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, তা স্পষ্ট করা জরুরি। কারণ ছাড়া এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিয়োগ বাতিল ও সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের মতো ঘটনা নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে জবাবদিহির ওপর
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর নেতৃত্বে বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের নিয়োগ ব্যাংকিং খাত সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন দিয়ে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসনের ঘাটতি দূর করা সম্ভব নয়।
নতুন এমডিদের কার্যকরভাবে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে। একই সাথে তাদের জন্য পরিমাপযোগ্য কর্মসম্পাদন সূচক নির্ধারণ, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং ফলাফল প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণ অনুমোদন ও আদায়ে স্বচ্ছতা, অনিয়মের জবাবদিহি এবং পরিচালনা পর্ষদের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন নেতৃত্বকে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপের বাইরে থেকে পেশাগত সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দিতে হবে। তা না হলে বেসরকারি ব্যাংকে অর্জিত অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বাস্তবতায় কাজে লাগানো কঠিন হবে।
তিন বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষে খেলাপি ঋণ কমানো, মূলধন পরিস্থিতির উন্নতি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হলে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা প্রমাণিত হবে। অন্যথায় নেতৃত্ব পরিবর্তন বড় সিদ্ধান্ত হয়েই থাকবে; কিন্তু ব্যাংকগুলোর কাক্সিক্ষত কাঠামোগত সংস্কার অধরাই থেকে যেতে পারে।