ইউরোপে চাপে পোশাক রফতানি
  • ৮ মাসে রফতানি কমেছে ১১.৬৭ শতাংশ, কমেছে গড় বিক্রয়মূল্যও
  • ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকির সাথে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়ের চাপ

ইউরোপের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও আবাসনসঙ্কট ঘিরে অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে ইউরোপের ভোক্তা ব্যয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে পোশাকের চাহিদা কমার পাশাপাশি নতুন ক্রয়াদেশ স্থগিত হওয়া কিংবা প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির মূল্য ও পরিমাণ কমেছে। কমেছে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রফতানিমূল্যও। অন্যদিকে দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি কমার পেছনে বিক্ষোভের প্রভাব কতটা, তা এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়া, ক্রেতাদের ব্যয় সঙ্কোচনের প্রবণতা, পণ্যের দাম নিয়ে চাপ এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর রফতানি পরিস্থিতি- সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা যখন কম দামে পণ্য চাইছেন, তখন দেশের অভ্যন্তরে কাঁচামাল, জ্বালানি ও শ্রমের ব্যয় বৃদ্ধি রফতানিকারকদের মুনাফায় চাপ তৈরি করছে।
৮ মাসে রফতানি কমেছে ১১.৬৭ শতাংশ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের উপাত্তের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমেছে। এ সময় রফতানির মূল্য ১৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ইউরো থেকে কমে ১১ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে রফতানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।  এ সময় বাংলাদেশের পোশাক রফতানির গড় বিক্রয়মূল্যও কমেছে। ইউরোস্ট্যাটের উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে ইইউতে বাংলাদেশ থেকে রফতানি করা প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, গড় রফতানিমূল্য কমেছে প্রায় ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
রফতানিমূল্য, পরিমাণ ও গড় বিক্রয়মূল্যের এই নি¤œমুখী প্রবণতা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ওপর চাপের চিত্র তুলে ধরছে। পণ্যের পরিমাণ কমার পাশাপাশি প্রতি কেজি পোশাক থেকে আয় কমে গেলে কারখানাগুলোর জন্য উৎপাদন ব্যয় মেটানো ও মুনাফা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানির মূল্য কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ, ইউরোপের বাজারে সামগ্রিক আমদানি হ্রাসের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে আমদানির মূল্য বেশি কমেছে। এটি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান, পণ্যের মূল্য এবং ক্রেতাদের ক্রয়াদেশের প্রবণতা নিয়ে নতুন করে বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
ফ্রান্সের ক্রেতার ক্রয়াদেশ স্থগিত
ইউরোপের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রভাব কিছু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। নারায়ণগঞ্জভিত্তিক ফতুল্লা ফ্যাশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানিয়েছেন, ফ্রান্সের একজন বড় ক্রেতা তাদের একটি ক্রয়াদেশ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বলেছেন। অথচ এর আগে দুই পক্ষের মধ্যে ক্রয়াদেশ নিয়ে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল।
নয়া দিগন্তকে ফজলে শামীম এহসান বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভের কারণে ফ্রান্সের অর্থনীতি আরো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে ওই ক্রেতা আশঙ্কা করছেন। এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে পোশাকের চাহিদাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইউরোপ বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের অন্যতম প্রধান বাজার। সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা দেখা দিলে তার প্রভাব এড়ানো বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য কঠিন হবে। তবে একজন ক্রেতার ক্রয়াদেশ স্থগিত রাখার ঘটনাকে পুরো ইউরোপের বাজারে একই ধরনের প্রবণতার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।
ইউরোপের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ইইউর প্রবৃদ্ধি হতে পারে ১ দশমিক ১ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ১ দশমিক ৫ শতাংশের তুলনায় কম। এ পূর্বাভাস ইউরোপের অর্থনৈতিক গতি নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত দিলেও এর সাথে পোশাকের চাহিদা হ্রাসের সরাসরি সম্পর্ক কম বেশি থাকতে পারে।
বিক্ষোভ, নাকি অর্থনৈতিক মন্দা- কোনটি বড় কারণ
ইউরোপে ক্রয়াদেশ কমার পেছনে বিক্ষোভের প্রভাব কতটা, তা নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, বিক্ষোভের চেয়ে ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দাই ক্রয়াদেশ কমার বড় কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও ক্রয়াদেশ কমছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার দুর্বলতা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য আগে থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপের অস্থিরতা সেই পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে, তবে রফতানি কমার পুরো দায় বিক্ষোভের ওপর চাপানো ঠিক হবে না।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেলও উৎপাদন ব্যয় ও ক্রেতাদের মূল্যচাপের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তার মতে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ইউরোপীয় ক্রেতারা পোশাকের বাড়তি দাম দিতে আগ্রহী নন। বরং তারা কম দামে পণ্য সরবরাহের জন্য চাপ দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্রেতারা আরো সতর্ক হয়ে উঠলে রফতানিকারকদের জন্য নতুন ব্যবসা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
প্রতিযোগিতায় এগোচ্ছে চীন ও ভিয়েতনাম
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় সীমাবদ্ধ নয়। একই বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর রফতানি পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউরোস্ট্যাটের উপাত্তের ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইইউতে চীনের পোশাক রফতানির মূল্য বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা বেড়ে ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। একই সময়ে ভিয়েতনামের রফতানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ, যা প্রায় তিন বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে ভারত, তুরস্ক, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের রফতানি কমেছে। তবে বিভিন্ন দেশের রফতানির পরিমাণ, পণ্যের ধরন ও গড় বিক্রয়মূল্যের পরিবর্তন এক রকম নয়। তাই শুধু রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি দিয়ে প্রতিযোগিতার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা শতভাগ বাস্তবতার প্রতিফলন নয়।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইউরোপের ক্রেতারা যখন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছেন, তখন উৎপাদন ব্যয়ের সামান্য ব্যবধানও ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে।
এ ক্ষেত্রে ভারত ও ভিয়েতনামের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক সম্পর্কও বিবেচনায় নেয়া জরুরি। এসব দেশের সাথে ইইউর বাণিজ্যচুক্তি, শুল্কহার, উৎসবিধি এবং বাজারে প্রবেশের শর্ত বাংলাদেশের মতো নয়। ফলে প্রতিযোগিতার প্রকৃত ব্যবধান নিরূপণে এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুবিধা ধরে রাখার বিষয়টিও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হওয়া দরকার।
সুতার দামে ব্যবধান, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়ের উদ্বেগ
ইউরোপের বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের আরেকটি উদ্বেগ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। কাঁচামাল সংগ্রহ, জ্বালানি সরবরাহ এবং শ্রমিকদের মজুরি- সব ক্ষেত্রেই ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর সাথে সুতার আমদানিসংক্রান্ত নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক যুক্ত হয়েছে।
দেশীয় বস্ত্রশিল্পকে সুরক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে নিট পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহার এবং ব্যাংক গ্যারান্টি আরোপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের সিদ্ধান্তটি স্থগিত করা হয়েছে। অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত কিছু সংবাদ প্রতিবেদনে সুতার আমদানিসংক্রান্ত বিধিনিষেধকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 
রফতানিকারকদের বক্তব্য, আমদানি করা সুতার তুলনায় দেশীয় সুতার দাম বেশি হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। ফকির ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির কামরুজ্জামান নাহিদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, আমদানি করা প্রতি কেজি ৩০ কাউন্টের কম্বড সুতার দাম ৩ দশমিক ১৫ ডলার। একই ধরনের সুতার দেশীয় বাজারমূল্য প্রতি কেজি ৩ দশমিক ৭৫ ডলার। অর্থাৎ, তার দেয়া হিসাব অনুযায়ী প্রতি কেজিতে দামের ব্যবধান ৬০ সেন্ট।
নাহিদ নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশীয় সুতা ব্যবহারে বাধ্য হলে প্রতি পিস পোশাকের উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১৫ সেন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিন্তু ইউরোপের অধিকাংশ ক্রেতা বাড়তি দাম দিতে রাজি নন। ফলে অতিরিক্ত ব্যয় ক্রেতাদের ওপর চাপানো না গেলে তা রফতানিকারকদের মুনাফা কমিয়ে দেবে। তবে সুতার মান, সরবরাহকারী, ক্রয়ের পরিমাণ ও সময়ভেদে দামও পরিবর্তিত হতে পারে।
নাহিদের মতে, দেশীয় বস্ত্রশিল্পের বিকাশ ও বিনিয়োগ সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তবে রফতানিমুখী পোশাকশিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহের ব্যয় এবং কার্যকরী মূলধনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। নীতিগত পরিবর্তনের ফলে দুই খাতের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা পর্যালোচনা করে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
জ্বালানি ও মজুরির চাপও বাড়ছে
পোশাক উৎপাদনের ব্যয়ে জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গ্যাসের চাপ কম থাকা কিংবা সরবরাহে অনিয়মের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে কারখানার পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হলে ব্যয় আরো বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে যখন ক্রেতারা দাম কমানোর চাপ দিচ্ছেন, তখন দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি রফতানিকারকদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকদের মজুরি ও উৎপাদনশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং অপচয় কমানোর উদ্যোগও জরুরি। এতে শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধি এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য আনা সহজ হবে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, শুধু মজুরি বা কাঁচামালের ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। উৎপাদনপ্রক্রিয়ার দক্ষতা বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রফতানিকারকদের আশঙ্কা, ইউরোপের বাজারে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে এবং একই সময়ে দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের কিছু সম্ভাব্য ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশে চলে যেতে পারে।
তবে ক্রয়াদেশ স্থানান্তরের ঝুঁকি কতটা বাস্তব, তা নির্ভর করবে ক্রেতাদের চাহিদা, বিভিন্ন দেশের উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের মান এবং সরবরাহ সক্ষমতার ওপর। এ কারণে সাময়িক বাজার পরিস্থিতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।
এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি
ইউরোপের বিক্ষোভ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য এমন এক সময়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে, যখন রফতানি আয় ও গড় বিক্রয়মূল্য ইতোমধ্যে চাপের মুখে। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় শুধু ইউরোপের অস্থিরতা কেটে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা, কাঁচামাল সংগ্রহে প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
একই সাথে ইউরোপের ক্রেতাদের চাহিদা, ভোক্তাদের ব্যয় এবং নতুন ও বিদ্যমান ক্রয়াদেশের পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। রফতানিকারকদের জন্য কার্যকরী মূলধনের জোগান সহজ করা, নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপে অস্থিরতা কত দিন চলবে, তা বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, অপচয় কমানো, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং কাঁচামাল সংগ্রহে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অবস্থান কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যয় ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায়, তার ওপর।

Advertisement