
- ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি শূন্য
- পরিশোধের চাপ ৫.৫৭ শতাংশ বেড়েছে
সরকার বিদেশীদের থেকে যে পরিমাণ সহায়তা পাচ্ছে তার থেকে দ্বিগুণের বেশি অর্থ দিয়ে দায় বা ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে এক ধরনের দায় পরিশোধের চাপে সরকার। একদিকে বিদেশী সহায়তার অর্থছাড় কমছে। অন্য দিকে পুরনো ঋণের কিস্তি মেটানোর দায় বাড়ছে। নতুন ঋণ-অনুদানের প্রতিশ্রুতির অঙ্ক বাড়লেও তাতে স্বস্তির ছবি নেই। কারণ, সেই প্রতিশ্রুতির বড় অংশ এসেছে ‘অন্যান্য’ উৎস থেকে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি), ভারত, চীন ও রাশিয়ার মতো ছয় প্রধান দাতা বা দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে নতুন সহায়তার কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ প্রাথমিক হিসাব বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর- এই তিন মাসে বাংলাদেশ বিদেশী সহায়তা পেয়েছে ৬৬ কোটি ২৩.১ লাখ ডলার। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১১৪ কোটি ৮৫.৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে অর্থছাড় কমেছে ৪৮.৬২৮ কোটি ডলার বা ৪২.৩৪ শতাংশ। আর ঋণের আসল-সুদ পরিশোধে ব্যয় ১৩৫.১২ কোটি ডলার।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতির চিত্রটি ভিন্ন। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে মোট প্রতিশ্রুতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২৭ কোটি ৩০ লাখ ৩০ হাজার ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৯১ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, প্রতিশ্রুতি বেড়েছে ৩৯.৭৯ শতাংশ। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির প্রায় পুরটাই এসেছে অন্যান্য উৎস থেকে। প্রধান দাতাদের বড় অংশের কাছ থেকে নতুন প্রতিশ্রুতি না আসায় বৈদেশিক সহায়তার উৎস ও প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিশ্রুতিতে ছয় দাতার অবদান নেই
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এডিবি, বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি), ভারত, চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে নতুন বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। এই সময়ে জাপানের কাছ থেকে ৩৫.১ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি এসেছে। বিপরীতে, ‘অন্যান্য’ শ্রেণীর দাতা ও উৎস থেকে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ১২৬ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। মোট প্রতিশ্রুতি ১২৭ কোটি ৩০ লাখ ৩০ হাজার ডলারের মধ্যে এই অর্থের অংশই সবচেয়ে বেশি।
দাতাভিত্তিক এই চিত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট- নতুন প্রতিশ্রুতির অঙ্ক বাড়লেও প্রচলিত প্রধান উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি আসেনি। অবশ্য প্রতিশ্রুতি না আসা মানেই সংশ্লিষ্ট দাতারা আগের প্রকল্পের অর্থছাড় বন্ধ রেখেছে, এমন নয়। তবে চলতি অর্থবছরে এডিবি, বিশ্বব্যাংক, ভারত, চীন ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থছাড় হয়েছে।
অর্থছাড়ে বড় পতন, কমেছে ঋণের প্রবাহ
ইআরডির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রকল্প সহায়তা বাবদ ছাড় হয়েছিল ১১৪ কোটি ৮৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে হয়েছে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, প্রকল্প সহায়তার অর্থছাড় কমেছে ৪২.৩৪ শতাংশ, যা ৮৮ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পতনের প্রধান কারণ ঋণ হিসেবে পাওয়া অর্থের ছাড় কমে যাওয়া। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে ঋণ ছাড় হয়েছিল ১০৩ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ৫৪ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। এক বছরে ঋণের অর্থছাড় কমেছে প্রায় ৪৭.৮ শতাংশ। অন্য দিকে অনুদানের অর্থছাড়ে উল্টো প্রবণতা দেখা গেছে। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে অনুদান পাওয়া গিয়েছিল ১০ কোটি ৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার। সেখানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ১১ কোটি ৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার। খাদ্য সহায়তার ক্ষেত্রে উভয় অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এক কোটি ডলার করে অর্থছাড় হয়েছে। ফলে সামগ্রিক বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় কমে যাওয়ার পেছনে প্রকল্প সহায়তা, বিশেষ করে ঋণের অর্থছাড় হ্রাসই বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ইআরডির সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্বব্যাংক-এডিবির অর্থছাড় আগের চেয়ে কম
দাতাগোষ্ঠীভিত্তিক ইআরডির পরিসংখ্যানেও অর্থছাড়ের চিত্রে পরিবর্তন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ থেকে ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ডলার ছাড় হয়েছে। যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৩২ কোটি ২৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এডিবি থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ছাড় হয়েছে ১৬ কোটি ২১ লাখ ১০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ১৮ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার ডলার।
জাপান থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার ছাড় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চার কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার ডলারের চেয়ে কম। জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন সংস্থা থেকে অর্থছাড় হয়েছে চার কোটি ১৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল চার কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার ডলার। আর ইউরোপীয় উৎস থেকে অর্থছাড়ের পরিমাণও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ইউরোপীয় উৎস থেকে ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার ছাড় হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে হয়েছে মাত্র ৬ কোটি ৮৪ লাখ ৯০ হাজার ডলার। এ দিকে ভারত থেকে ১০ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার ডলার, চীন থেকে মাত্র এক কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার এবং রাশিয়া থেকে দুই কোটি সাড়ে ৬ লাখ ডলার অর্থছাড় হয়েছে। তবে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে এই সময়ে কোনো অর্থছাড় হয়নি।
ঋণের আসল-সুদ পরিশোধে বাড়তি চাপ
অর্থ ছাড় ও প্রাপ্তি কমে গেছে। কিন্তু বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় কমার বিপরীতে ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার ডলার পরিশোধ করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১২৭ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ৭ কোটি ১২ লাখ ৮০ হাজার ডলার বা ৫.৫৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আসল ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৮৫ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৮১ কোটি ৬৯ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অন্য দিকে সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৪৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৪৬ কোটি ২৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশী মুদ্রায় চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬৪ কোটি ৬৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ১ হাজার ৫৫৯ কোটি ১৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা। টাকার হিসাবে পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ১০৫ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেই স্থবিরতা
আইএমইডির তথ্য বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন নিয়ে এক দিকে রয়েছে বরাদ্দের বিপুল অঙ্ক, অন্য দিকে রয়েছে অর্থ ব্যয়ের গতি, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক অগ্রগতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ। প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপরই বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড় এবং নতুন করে বিদেশী সহায়তা প্রাপ্তি নির্ভর করে। এখানে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক সহায়তার মধ্যে তিন মাসে মাত্র ৩ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা খরচ হয়েছে প্রকল্পে। ১৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের প্রকল্পের বিপরীতে পাওয়া বৈদেশিক সহায়তার অর্থের এক টাকাও খরচ করতে পারেনি। কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, সেতু বিভাগ, খাদ্য মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় (থোক বরাদ্দসহ), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় বিদেশী সহায়তার অর্থ খরচ করতে পারেনি।
সহায়তার প্রতিশ্রুতি বাড়লেও স্বস্তি কোথায়?
ইআরডির সংশ্লিষ্টরা এবং অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি বাড়া সাধারণভাবে ইতিবাচক। তবে প্রতিশ্রুতির অর্থ হাতে আসা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হওয়ার মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের তথ্য সেই পার্থক্যকেই সামনে এনেছে। এক দিকে নতুন প্রতিশ্রুতির অঙ্ক বেড়েছে, অন্য দিকে প্রকল্প সহায়তার অর্থছাড় কমেছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থছাড়ের গতি বাড়ানো, প্রতিশ্রুত সহায়তা দ্রুত ছাড়ের ব্যবস্থা করা এবং বৈদেশিক ঋণের অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের অর্থায়ন রয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও অর্থছাড়ের ধীরগতির কারণ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








