তদন্ত কার্যক্রমে ডিএসইকে আরো বস্তুনিষ্ঠ হতে বলল বিএসইসি

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
আবার ধারাবাহিক পতনের দিকেই এগোচ্ছে পুঁজিবাজার। গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সূচক হারিয়েছে দেশের পুঁজিবাজারগুলো। আর এর ফলে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি গতকাল নেমে আসে বিগত পাঁচ মাসের সর্বনি¤œ অবস্থান ৫ হাজার ৩৯৯ দশমিক ৫২ পয়েন্টে। চলতি বছরের ১ জুনের পর আর এ পর্যায়ে নামেনি সূচকটি।
গতকাল সূচকের উন্নতিতে লেনদেন শুরু করা বাজারগুলো মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় বিক্রয়চাপে পড়ে। লেনদেনের বিভিন্ন পর্যায়ে বাজারগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি। ধীরগতির বাজারে লেনদেনের শেষ দিকে এসে বিক্রয়চাপ আরো তীব্র আকার ধারণ করলে সূচকের বড় অবনতি দিয়েই লেনদেন শেষ করে দুই পুঁজিবাজার। 
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৩ দশমিক ০১ পয়েন্ট হারায়। ৫ হাজার ৪৩২ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার লেনদেন শেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৩৯৯ দশমিক ৫২ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১০ দশমিক ৯৮ ও ৭ দশমিক ২৫ পয়েন্ট।
অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক গতকাল ২২ দশমিক ৭৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ১৪ হাজার ৫৮১ দশমিক ৪২ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি বিকেলে লেনদেন শেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৫৫৮ দশমিক ৬৪ পয়েন্টে। একই সময় পুঁজিবাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচক হ্রাস পায় যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৫৩ ও ১৮ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট। 
সূচকের পাশাপাশি অবনতি ঘটেছে ডিএসইর লেনদেনেও। ঢাকা স্টক গতকাল ৪১০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিনের চেয়ে ২০ কোটি টাকা কম। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৪৩০ কোটি টাকা। তবে লেনদেনে আগের দিনের অবস্থান ধরে রেখেছে সিএসই। রোববারের মতো সোমবারও সিএসইর লেনদেন ছিল ১৬ কোটি টাকা। দিনের শুরুতে বাজারগুলোর লেনদেনে কিছুটা গতি থাকলেও বিক্রয়চাপে গতি হারায় দুই বাজার। 
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে বিনিয়োগকারীর উপস্থিতি থাকলেও টানা দরপতনের শিকার হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে সৃষ্টি আস্থাহীনতা থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজার। ফলে ইতোমধ্যে বাজারকে গতিশীল করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো থেকে নেয়া উদ্যোগ খুব একটা সাড়া পাচ্ছে না। তা ছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষের নেয়া এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য সুফল বয়ে আনার কথা থাকলেও তা তাৎক্ষণিক বাজার পরিস্থিতি পাল্টে দেয়ার মতো আস্থাশীল করতে পারছে না বিনিয়োগকারীদের। তাই বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই এ মুহূর্তে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। তারা লেনদেনে অংশ নেয়ার চেয়ে বাজার আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন। 
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সাময়িক এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের বিক্রয়চাপ বৃদ্ধির পরিবর্তে ধৈর্য ধারণ করাই উচিত। কারণ বরাবরই খারাপ অবস্থা থেকে আবার বাজার আচরণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অথচ এই সময়ে যারা লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন তারা নিজেদের পুঁজিকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। অতএব তাদের মতে, ভালো সময়ের অপেক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই। 
এ দিকে পুঁজিবাজারে বিভিন্ন ‘কারসাজি’ ও অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি আরো বেশি মনোযোগ দিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে নির্দেশনা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। রোববার ডিএসই কর্তৃপক্ষের সাথে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ নির্দেশনা দেন বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান। বৈঠকে বিএসইসির কমিশনার নাফিজ তারিক, নির্বাহী পরিচালক শেখ মাহবুবুর রহমান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার, শেয়ারহোল্ডার পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র অনুসারে, বিএসইসির চেয়ারম্যান ডিএসইর মনিটরিং ও তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ডিএসইর বাজার তদারকি ও তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়েছে। আমরা বাজারে যে কোনো অনিয়ম, কারসাজি ইত্যাদির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, ডিএসইর তদন্ত প্রতিবেদনে তেমন সারবস্তু থাকে না, তথ্য-উপাত্ত এমনকি প্রমাণদিরও ঘাটতি থাকে। তাই এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায় না।
বিএসইসি চেয়ারম্যান ডিএসই কর্তৃপক্ষকে বলেন, তদন্ত শুধু তদন্তের জন্য নয়, কিংবা তদন্ত যেন উদ্দেশ্যমূলক না হয় সে বিষয়ে সজাগ থাকতে বলেন। এজন্য গণহারে লেনদেন ও বিনিয়োগকারীদের তথ্য না চাওয়া, তথ্য চাওয়া হলেও তা যেন বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে সে বিষয়ে যতœবান হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তভিত্তিক তদন্ত ও তদারকির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
তিনি ঢালাওভাবে চিঠি দিয়ে তথ্য সংগ্রহের পরিবর্তে সার্ভিল্যান্স সিস্টেম থেকে তথ্য নিয়ে তা যাচাই বাছাই করে কারসাজির কোনো প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেলে তখন ওই বিনিয়োগকারী ও তার পোর্টফোলিও সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের জন্য চিঠি দেয়ার পরামর্শ দেন।
ডিএসই কর্তৃপক্ষ বিএসইসি চেয়ারম্যানের উদ্বেগের সাথে একমত পোষণ করেন। তারা বাজার তদারকি ও তদন্তের ক্ষেত্রে আরো সতর্ক থাকার ব্যাপারে বিএসইসি চেয়ারম্যানকে আশ্বস্ত করেন।

Advertisement