উন্নয়নে বাজেট বাড়ে প্রকল্পের গতি কমে!
  •  এডিপিতে প্রথম তিন মাসেই ধাক্কা, ১৫ মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ে প্রশ্ন
  •  সেপ্টেম্বরেও কাজে গতি ফেরেনি, বাস্তবায়ন হার মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ

উন্নয়নের বাজেট প্রতি বছরই বাড়ছে। একের পর এক প্রকল্প নেয়া হচ্ছে; কিন্তু সেই প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ খরচের গতি খুবই ধীর। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) উন্নয়ন ব্যয়ের পরিসংখ্যান সামনে এনেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তিন মাসে অগ্রগতি মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন নিয়ে এক দিকে রয়েছে বরাদ্দের বিপুল অঙ্ক, অন্য দিকে রয়েছে অর্থ ব্যয়ের গতি, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক অগ্রগতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ। এডিপিতে প্রথম  তিন মাসেই ধাক্কা, ১৫ মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ে প্রশ্ন। সেপ্টেম্বরেও কাজে গতি ফেরেনি, শুরু হয়নি ১২ প্রকল্পের কাজ। ১৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ১১টিই নিজস্ব অর্থ খরচে অক্ষম বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ তথ্যে বেরিয়ে এসেছে। 
আইএমইডি তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এডিপির আওতাভুক্ত ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য নির্ধারিত এক লাখ ৬৩ হাজার ৪২৯ কোটি ৬৪ লাখ ৯২ হাজার টাকার বিপরীতে ব্যয়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১০ হাজার ৮২৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের মোট এডিপির আকার হলো তিন লাখ আট হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এখানে জিওবি হলো এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, বিদেশী সহায়তা এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব হলো আট হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। তিন মাসে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ১৮ কোটি টাকা বা ৩.৮৯ শতাংশ।  
বরাদ্দের পাহাড়, বাস্তবায়নের গতি কতটা?
এডিপির আকার গত কয়েক বছরে বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এডিপির বরাদ্দ ছিল দুই লাখ ৫৬ হাজার তিন কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ আট হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ, পাঁচ অর্থবছরের ব্যবধানে উন্নয়ন বাজেটের আকার বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এই বৃদ্ধির পরিমাণ হলো ৫২ হাজার ৯২১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা; কিন্তু বরাদ্দ বাড়ার সাথে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কতটা বেড়েছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। উন্নয়ন বাজেটের মূল উদ্দেশ্য অবকাঠামো নির্মাণ, জনসেবা সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনা। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে বরাদ্দের কাক্সিক্ষত সুফলও পিছিয়ে যায়।
আগের অর্থবছরগুলোর প্রথম তিন মাসের ব্যয়ের হার তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য দেয়া হিসাবে হার ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ।
১৫ মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ে বৈষম্য
এডিপির আওতায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ব্যয়ের অগ্রগতিতেও পার্থক্য রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৩০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বরাদ্দ ২৬ হাজার ৮৭০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রদত্ত তথ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ের হার ২ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য সেবা খাতে ১.৭৮ শতাংশ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ের হার ৪.৬৬ শতাংশ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। স্থানীয় সরকার বিভাগ থোক বরাদ্দসহ ১২.৪২ শতাংশ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ ১৩.০৭ শথাংশ বাস্তবায়ন হার। 
সেপ্টেম্বরেও ব্যয়ের চাপ
চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে এডিপি খাতে ব্যয়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ছয় হাজার ৩০৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন বা জিওবি অংশে ব্যয় চার হাজার ৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য খাতে দুই হাজার ১০৪ কোটি ১১ লাখ টাকা। নিজস্ব অর্থায়নে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৯৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। প্রকল্প সাহায্য ও সরকারি অর্থায়নের অর্থছাড় এবং ব্যয়ের গতি এডিপি বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে বিদেশী ঋণ ও অনুদাননির্ভর প্রকল্পে অর্থছাড়, ক্রয়প্রক্রিয়া, পরামর্শক নিয়োগ এবং ঠিকাদার নির্বাচনসহ বিভিন্ন ধাপের বিলম্ব প্রকল্প বাস্তবায়নকে প্রভাবিত করতে পারে। আইএমইডির তথ্যের বরাতে দেয়া হিসাবে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে মোট প্রকল্পের সংখ্যা এক হাজার ১৭২টি। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৮৬টি, সমীক্ষা প্রকল্প ২৩টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১০৯টি, উন্নয়ন সহায়তা খাতের প্রকল্প ৯টি। নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের সংখ্যা ৪৫টি।
নজর দিতে হবে বাস্তবায়নে -আইএমইডি
আইএমইডির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এডিপির সাফল্য শুধু বরাদ্দের আকার দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকল্প সময়মতো শেষ হচ্ছে কি না, ব্যয়ের বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতি কতটা, সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ছে কি না এবং জনগণ নির্ধারিত সময়ে সুফল পাচ্ছে কি না- এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের পরিসংখ্যান তাই শুধু ব্যয়ের হিসাব নয়; উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা মূল্যায়নেরও একটি সুযোগ। কোন মন্ত্রণালয় বরাদ্দের বিপরীতে পিছিয়ে রয়েছে, কোন প্রকল্পে অর্থ ছাড়ে বাধা রয়েছে এবং কোথায় বাস্তবায়ন প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। বছরের শেষ দিকে ব্যয় বাড়ানোর তাড়াহুড়োর পরিবর্তে শুরু থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা গেলে অর্থের গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হবে। অন্যথায় উন্নয়ন বাজেটের আকার বাড়লেও নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা এবং জনগণকে তার সুফল পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আবু আহমেদের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, যে দেশে উৎসবের নামে এত বন্ধ থাকে সেখানে কিভাবে উন্নয়ন হবে। পৃথিবীতে এমন দেশ নেই যেখানে এতদিন বন্ধ থাকে। তিনি বলেন, অর্থছাড় ঠিক মতো না হলে, যথাসময়ে প্রকল্প নেয়া না হলে, সঠিকভাবে তদারকি করা না হলে বাস্তবায়ন কিভাবে হবে।

Advertisement