
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মুহূর্তে ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালাতে পারে অথবা তেহরানের সাথে একটি বড় চুক্তি হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও সামরিক হুমকি প্রত্যাখ্যান করে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে এবং ভয় দেখিয়ে তেহরানকে নতজানু করা যাবে না। খবর মেহের নিউজ এজেন্সি, তাসনিম নিউজ এজেন্সি, আলজাজিরা, রয়টার্স ও এএফপির।
শনিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ওয়াশিংটন চাইলে আজই ইরানে দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে কিংবা তেহরানের সাথে একটি ‘বড় ও চমৎকার’ সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে। তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের কথা না জানিয়ে তিনি দাবি করেন, তেহরান সমঝোতা চায় কিন্তু সেই চুক্তি তারা মানবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ট্রাম্পের ভাষ্য মতে, তার একমাত্র লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে চিরতরে বিরত রাখা। এর আগে মার্কিন বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে সামরিক অভিযান চালানো হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী ফল নিশ্চিত করতে পারেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার জয় যুক্তরাষ্ট্রেরই হবে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ওহিওর এক জনসভায় ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করার পর জবাবে ট্রাম্প ওবামাকে ‘অযোগ্য প্রেসিডেন্ট’ আখ্যা দেন। ওবামা অভিযোগ করেছিলেন, ট্রাম্প সরকার একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ শুরু করেছে যা পুরো বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
জবাবে ট্রাম্প ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) বাতিলের সিদ্ধান্তকে সঠিক দাবি করে বলেন, ওবামা প্রশাসন অতীতে ইরানকে বিলিয়ন ডলার দিয়ে তুষ্ট করেছিল। ট্রাম্প আরো দাবি করেন, ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ ও ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা, আকাশপথ, নৌবাহিনী ও শীর্ষ নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। একই সাথে তিনি মন্তব্য করেন, ইরানের প্রথম ও দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় আলোচনার জন্য এখন কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে, তা নির্ধারণের জন্য ইরানি নেতাদের হত্যা করা বন্ধ করা প্রয়োজন।
এ দিকে তেহরানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাকচি মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিদেশী সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাইরের শক্তিগুলো কেবল ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ অঞ্চলে অবস্থান করছে এবং এতে নিরাপত্তাহীনতা আরো বাড়ছে। ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার বিনিময়ে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়ার যে সংবাদ ‘আল আরাবিয়া’ প্রচার করেছে, সেটিকে ‘মিথ্যা ও কল্পনাপ্রসূত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান। তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেয়া তথ্যে জানানো হয়, বন্দর ও সামুদ্রিক নৌসীমায় মার্কিন হস্তক্ষেপ বন্ধসহ ইরানের সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগত এই প্রণলীর নিরাপত্তাহীনতা দূর হবে না।
ইতোমধ্যেই যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার স্পষ্ট আভাস পাওয়া গেছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘লুকাস’ মডেলের একটি চালকবিহীন অ্যাটাক ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইরানের সেনাবাহিনী। অন্য দিকে মার্কিন রণতরি ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন থেকে যুদ্ধবিমানগুলোকে প্রস্তুত রাখার খবর পাওয়া গেছে। এর জবাবে ইরানের সশস্ত্রবাহিনীর চিফ অব স্টাফ আলী আবদুল্লাহি চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই মার্কিন সামরিক জাহাজকে পারস্য উপসাগরে ঢুকতে দেয়া হবে না এবং এ দৃশ্য দেখার স্বপ্ন নিয়েই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কবরে যেতে হবে।
ইরানের অভ্যন্তরে চলমান যুদ্ধের ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে স্বীকার করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এই ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ পরিস্থিতির অর্থনৈতিক চাপে দেশের অসংখ্য মানুষ প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই চরম হিমশিম খাচ্ছে। দ্রুত এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পতনের যে হুমকি দিয়েছেন, তার কড়া জবাব দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি। ফারসি, ইংরেজি ও হিব্রু ভাষায় দেয়া এক বার্তায় তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরাইলের একটি ভুল পদক্ষেপই যথেষ্ট- এক ঘণ্টারও কম সময়ে তাদের অধিকৃত ভূখণ্ডকে বসবাসের অযোগ্য করে ফেলা হবে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি মার্কিন হুমকিকে স্রেফ প্রচারণানির্ভর মনস্তাত্ত্বিক খেলা বলে অভিহিত করেছেন। অন্য দিকে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, বর্তমান ইরান পাহলভি আমলের দুর্বল ইরান নয়; এটি এক অটুট দুর্ভেদ্য দুর্গ। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ভুল চালের কারণে সৃষ্টি হওয়া জাঁতাকলে নিজেই আটকে গেছে এবং এ থেকে বের হওয়ার পথও তাদেরই খুঁজতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








