২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই, আমরা তোমাদের ভুলব না, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ, আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, ওয়াসিম আকরাম, বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস
শহীদ আবু সাঈদ। সংগৃহীত

 

Advertisement

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ের পাতায় পাতায় এবার যুক্ত হয়েছে ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগকারী জুলাই শহীদদের বিরত্বগাথার গল্প। আত্মোৎসর্গকারী এই বীরদের নানা বিরত্বের কথা নতুন প্রজন্মকে দেশের প্রতি ভালোবাসা আর স্বৈরাচারদের মুখোশ উন্মুচনে উৎসাহ জোগাবে। কেননা এই বীর শহীদের স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ  করা। শহীদদের অনেকেই তখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, কেউ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পানি বিতরণ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, আবার কেউ অধিকার আদায়ের সংগ্রামে রাজপথে নেমে শহীদ হয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও ওয়াসিম আকরামের আত্মত্যাগের সেই ইতিহাস এবার উঠে এসেছে পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা পাঠ্যবইয়ে।
পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা বইয়ের ২২ নম্বর পাঠে ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’ শীর্ষক গল্পে তুলে ধরা হয়েছে এই তিন শহীদের ভূমিকা। একই সাথে বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগের কথাও স্থান পেয়েছে গল্পটিতে। গল্পটির মূল বার্তা- দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের অবদান কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়।
অন্য দিকে ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’ গল্পে বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে রয়েছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা তিতুমীর, সূর্য সেন ও প্রীতিলতার আত্মত্যাগের কথা। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শহীদ সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বারের অবদানও তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আসাদ, ছাত্র মতিউর ও তার মা আনোয়ারা বেগম, সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং অধ্যাপক শামসুজ্জোহার আত্মত্যাগের কথাও রয়েছে গল্পটিতে। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান স্মরণ করা হয়েছে।
স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন আন্দোলনে শহীদদের কথাও বাদ যায়নি। ১৯৮৩ সালের আন্দোলনে সেলিম-দেলোয়ার, ১৯৮৭ সালের আন্দোলনে নূর হোসেন এবং ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনে ডা. মিলন ও জেহাদের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে একই গল্পে তুলে ধরে নতুন প্রজন্মের সামনে দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ণনায় উঠে এসেছে অধিকার ও বৈষম্যের প্রশ্ন। গল্পে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সংগ্রাম ও অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের পরও দেশে বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথও মসৃণ হয়নি। সেই বাস্তবতায় বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাজপথে নামেন শিক্ষার্থীরা।
রংপুরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। গল্পে তার সেই প্রতিবাদী অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে, পুলিশ তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে। আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম দেয়। ক্রমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আবু সাঈদের আত্মত্যাগ এখানে কেবল একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা নয়; বরং অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আরেক পরিচিত মুখ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। ঢাকার উত্তরায় আন্দোলনরত মানুষের মধ্যে পানি বিতরণ করছিলেন তিনি। আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানোর সেই মানবিক ভূমিকার মধ্যেই তার নাম যুক্ত হয়ে যায় জুলাইয়ের শহীদদের তালিকায়।
অন্য দিকে চট্টগ্রামে শহীদ হন ওয়াসিম আকরাম। গল্পে তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই তিন তরুণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গল্পটিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভিন্ন ভিন্ন দিক- প্রতিবাদ, মানবিকতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। গল্পটিতে আবু সাঈদ, মুগ্ধ ও ওয়াসিমের পাশাপাশি গোলাম নাফিজ, নাহিয়ানসহ আরো অনেক শহীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। তাদের মধ্যে ছিল মায়ের কোলের শিশু, বাবার সাথে খেলতে থাকা কিশোরও। গল্পের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে দেড় হাজারের বেশি মানুষ জীবন দিয়েছেন। অনেকে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, আবার অনেকে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তাদের এই আত্মত্যাগের পেছনে ছিল বৈষম্যহীন, সুন্দর ও সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা একটি রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন।
গল্পের শেষাংশে শহীদদের স্মরণ করে বলা হয়েছে, তারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। তাদের স্বপ্ন ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সবাই মিলেমিশে বসবাস করবে এবং মানুষের মধ্যে বৈষম্য থাকবে না। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নতুন প্রজন্মেরও।
পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা পাঠ্যবইয়ে ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’ গল্পের অন্তর্ভুক্তি শিশুদের সামনে বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। গল্পটিতে বিভিন্ন প্রজন্মের শহীদদের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে সাম্প্রতিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাও। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। একই সাথে অধিকার, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও বৈষম্যহীন সমাজের আকাক্সক্ষা সম্পর্কেও ধারণা পেতে পারে। ইতিহাসের প্রতিটি আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগের পেছনে ছিল একটি প্রত্যাশা- মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা। ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’ গল্পের নামের মধ্যেই সেই প্রত্যয় ফুটে উঠেছে। দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের স্মরণ করা এবং তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকারই গল্পটির মূল শিক্ষা।