
- সড়ক অবরোধ করে ভারী অস্ত্রের মহড়া ইউপিডিএফের
- মিয়ানমার ও ভারত থেকে ঢুকছে যুদ্ধাস্ত্র
হাতে ভারী অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিচ্ছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) একদল সদস্য। তার পাশেই সড়ক অবরোধ করে জ্বালানো হচ্ছে আগুন। কোনো যান চলাচল না করলেও মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দিতে দেখা গেছে পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফকে। গতকাল দুপুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা লক্ষ্মীছড়ি রাঙাপানি এলাকায়। এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পাহাড়ি-বাঙালিসহ দেশের পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এ দিকে পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পাঁচ হাজারেরও বেশি সদস্যের হাতে অত্যাধুনিক একে-৪৭ রাইফেলসহ ভারী আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে। এসব আগ্নেয়াস্ত্র পাশের দেশ মিয়ানমার ও ভারত থেকে আসা। এসব অস্ত্র দিয়ে পাহাড়কে অশান্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠছে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো। এ ছাড়া ভয়ভীতি দেখিয়ে বছরে হাজার কোটি টাকার চাঁদা আদায় করছে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভারত-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় পার্বত্যাঞ্চলের ৪৯১ কিলোমিটার এলাকায় কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। ওই সব জায়গা দুর্গম হওয়ায় মিয়ানমার ও ভারত থেকে ওই সব রুট দিয়ে অবাধে ঢুকছে ভারী অস্ত্র, মর্টারসেলসহ বিভিন্ন গোলাবারুদ।
বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের সাবেক চার সশস্ত্র সদস্যের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ওই চার সদস্য গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন- এসএমজি ও একে-৪৭ এর মতো ভারী অস্ত্র এখন ইউপিডিএফের হাতের নাগালে। রিভলবার বা পিস্তল সাধারণত সবার কাছেই থাকে। তাদের ভাষ্য, সম্প্রতি অবরোধ ও অগ্নিকাণ্ডের যেসব ঘটনা ঘটছে, তা পরিকল্পিতভাবে ঘটছে। পাহাড়ে ইউপিডিএফ ও জেএসএস আধিপত্যের লড়াই এবং চাঁদা আদায়ের জন্যই অস্থিরতা তৈরি করে রাখে। এর বাইরেও দুই দেশের (মিয়ানমার-ভারত) বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো সবসময় ওয়াকিটকিতে যোগাযোগ করে। এখন সরাসরি তারা স্টারলিংকের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন। তাদের দাবি, বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ককে তারা বিশ্বাস করেন না। তাই সরাসরি স্টারলিংকের মাধ্যমে ত্রিদেশীয় যোগাযোগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব অস্ত্র ব্যবহার করা হয় তারা সেগুলো ব্যবহার করছে।
ইউপিডিএফের সাবেক ওই চার সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, তারা এই দলের সাথে কেউ ১৫ বছর, কেউ পাঁচ বছর ধরে কাজ করেছেন। তারা জানান, একসময় এসএমজির মূল্য ছিল সোয়া তিন লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। বর্তমানে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি হয় এসব অস্ত্র। একে- ৪৭ একই মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। ক্ষুদ্র অস্ত্র সেকেন্ড হ্যান্ড, যার দাম ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা। বড় চালানের সাথে একটি বা দু’টি ছোট অস্ত্র বিনামূল্যে দেয়া হয়। তবে গুলির মূল্য আলাদাভাবে দিতে হয়। ৩৫০ টাকা দামের একটি এসএমজি বুলেট এখন এক হাজার ২০০ টাকায় পাওয়া যায়। এম-৬ রাইফেলের বুলেট ২৫০ টাকা থেকে ২৭০ টাকায় পাওয়া যায়। রাইফেলের মূল্য পাঁচ লাখ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।
চারজনেরই ভাষ্য ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব ভারী অস্ত্র পাচার করা হয়। আগে বেশির ভাগ অস্ত্র মিয়ানমার থেকে আসত কিন্তু এখন ভারত ও মিয়ানমার থেকে নিয়ে এসব অস্ত্র অবাধে বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। তারা জানান, সবজি বা অন্যান্য পণ্যের আড়ালে সিল করা ব্যাগে অস্ত্রগুলো বহন করা হয়। বাংলাদেশে প্রবেশের পর সশস্ত্র ইউপিডিএফ সদস্যরা চার পাশে ঘিরে ফেলে। যেন অন্য কোনো সশস্ত্রগোষ্ঠী সেখানে আসতে না পারে। এরপর অস্ত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর তারা সাথে করে নিয়ে যাওয়া অর্থ লেনদেন করে। তবে সে ক্ষেত্রে কোনো ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করা হয় না।
অস্ত্রের অর্ডার দেয়া হয় কিভাবে জানতে চাইলে তারা বলেন, হোয়াটসঅ্যাপের মতো এনক্রিপ্ট করা মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে একটি কমান্ড চেইনের মাধ্যমে অর্ডার পাঠানো হয়। যদি পাঁচটি বড় অস্ত্র প্রয়োজন হয়, তাহলে একা তাদের সাথে কন্টাক্ট করা হয় না, একটি সিস্টেম আছে এবং প্রত্যেকেরই একটি ভূমিকা আছে। স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর জোরপূর্বক কর (চাঁদা) আদায়ের মাধ্যমে তহবিল আসে। এখানে টুল (চাঁদা) না দিয়ে একটি মুরগি-কলাও বিক্রি করা যায় না।
চোরাচালানের রুট : আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং সাবেক সশস্ত্রগোষ্ঠীর সদস্যরা অস্ত্র চোরাচালানের জন্য রাঙ্গামাটিতে চারটি প্রধান অস্ত্র রুট চিহ্নিত করেছেন। তার মধ্যে মিয়ানমারের আরাকান আর্মির কাছ থেকে প্রায় অস্ত্র ভারতের মিজোরাম হয়ে থানচি, লুলংছড়ি, ছোটপোতিঘাট, ঘিলাতলী বা বসন্তোপাড়া হয়ে আসছে। আরেকটি রুট বান্দরবানে অস্ত্র পাঠায়, রাঙ্গামাটিতে আসে রাইখালী বাজার, বড়ইছড়ি, কাউখালী ও বিলাইছড়ি হয়ে। তৃতীয় একটি পথ মিয়ানমারকে মিজোরাম, তার পর রাঙ্গাপাড়া ও বাঘাইছড়ির সাথে সংযুক্ত করে এবং চতুর্থটি সাজেক লংকর পয়েন্টে যায়।
এ দিকে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন মাসের মধ্যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৯০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬২৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে ৯৬ জনকে গ্রেফতার করে।
ভারতে জব্দ : ভারতীয় পুলিশ এ বছর ইউপিডিএফ ও মিয়ানমারভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর সাথে যুক্ত একাধিক অস্ত্রের চালান জব্দ করেছে। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি মিজোরামে পাঁচজন অপারেটিভ-ইউপিডিএফের দু’জন এবং চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (সিএনএফ) তিনজনকে এম-১৬ রাইফেল, একে-৪৭, গ্রেনেড, ১০ হাজারের এরও বেশি গুলি এবং একটি ৪০ মিমি গ্রেনেড লঞ্চারসহ আটক করা হয়েছে। একই বছরের ২১ জানুয়ারি ত্রিপুরায় মিলন চাকমা এবং সমাজ প্রিয় চাকমাকে ৯এমএম পিস্তল এবং গুলিসহ গ্রেফতার করা হয়। দুই দিন পর রাজু চাকমাকে অরুনাচল-নাগাল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি একে-৪৭ ও ৪৫টি গুলিসহ গ্রেফতার করা হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মিজোরামে জেএসএসের (মেইন) তিন সদস্যের কাছ থেকে দু’টি একে-৪৭, পাঁচটি এম-৪ কার্বাইন ও হাজার হাজার গুলি জব্দ করে বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
নজরদারি বেড়েছে : ভারত বা মিয়ানমার থেকে এসএমজি ও একে-৪৭-সহ আগ্নেয়াস্ত্র কিভাবে পাচার হচ্ছে সে সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে রাঙ্গামাটির এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাঙ্গামাটি অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানের সীমান্তবর্তী জেলা। এটি বাংলাদেশ ভারত ও মিয়ানমারের ত্রি-সংযোগস্থলে অবস্থিত। জেলার বিশাল আকারের কারণে, এটি বিদেশী দেশগুলোর সাথে কয়েক শ’ কিলোমিটার সীমান্ত ভাগ করে নেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হল এই সীমান্ত কেবল কঠিন পাহাড়ি ভূখণ্ডজুড়েই বিস্তৃত নয়, বরং নদী ও হ্রদও রয়েছে, যার ফলে এটি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে। এই কর্মকর্তা বলেন, এই বাধা সত্ত্বেও অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সাথে সেনাবাহিনী ও বিজিবি অক্লান্ত পরিশ্রম করছে।
রাঙ্গামাটিতে অবরোধের প্রভাব পড়েনি শহরে, সাজেকে কর্মসূচি অব্যাহত
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, সাজেকে চলমান বিক্ষোভের সমর্থনে এবং ঘরবাড়ি-দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে ছাত্রজনতা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা অর্ধদিবস সড়ক অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল থেকে অবরোধ চলাকালীন রাঙ্গামাটি শহরের ভেতরে যানবাহন ও নৌপথে নৌ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। তবে জেলা শহর থেকে রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ির গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি-বান্দরবান যান চলাচল সচল ছিল। শনিবার হাটের দিন হওয়ায় শহরের বিভিন্ন সড়কে স্বাভাবিক ব্যস্ততা দেখা গেছে।
সকালে শহরের মানিকছড়ি ও কুতুকছড়ি সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে আন্দোলনকারীদের পিকেটিং করতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও সড়কের ওপর গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধের সমর্থনে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা।
এ দিকে আইনশৃঙ্খলা ও সার্বিক নিরাপত্তায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সহিংসতা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার রাখা হয়েছে। এখনো পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব জানান, অবরোধকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেজন্য পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও জোরদার টহলের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
জনভোগান্তি ও জরুরি সেবার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অবরোধ চলাকালে জরুরি সেবাসমূহকে এই কর্মসূচির আওতামুক্ত রাখা হয়। অ্যাম্বুলেন্স, রোগীবাহী যানবাহন, ফায়ার সার্ভিস, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী পরিবহন এবং সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিকদের গাড়ি অন্যান্য দিনের মতোই নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাচল করেছে।
এ দিকে রাঙ্গামাটির সাজেকে ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন’-এর যৌথ উদ্যোগে ঘোষিত তিন দফা দাবির সমর্থনে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি তৃতীয় দিনের মতো শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়। বর্তমানে সাজেক ও আশপাশের এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাজেকে অবস্থানরতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








