
- ২২ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান আড়াই লাখ কোটি টাকারও বেশি
- খেলাপি ঋণের জালে আটকে ব্যাংকের আয়, ৪ আইন সংস্কারের উদ্যোগ
দেশের ব্যাংকিং খাত আয়ের সঙ্কটে পড়েছে। কার্যক্রম থেকে মুনাফা হলেও প্রভিশন ঘাটতি ও খেলাপি ঋণের চাপে খাতটি এখন নিট লোকসানে। প্রতি তিন মাস অন্তর বাড়ছে খেলাপি ঋণ। অতীতের দুঃশাসন ও দুর্নীতির কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত এখন খাদের কিনারায়। ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি শ্রেণিকৃত ঋণ ব্যাংকিং খাতের আয়ের পথ আটকে রেখেছে। এখন আইন বদল, ঋণ আদায়ের নতুন কাঠামো আর কড়া তদারকি দিয়ে সেই বোঝা নামানোর চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৮৯ কোটি টাকা। কিন্তু নিট ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকায়। সম্পদ থেকে প্রাপ্তি (আরওএ) ঋণাত্মক ১.০৩ শতাংশ, আর মূলধনের ওপর প্রতিদান (আরওই) ঋণাত্মক ৪৪.২২ শতাংশ। ২২টি ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে চলছে, যার মোট পরিমাণ ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।
এখন চার আইন সংশোধন করে ব্যাংকিং খাত থেকে লাভজনক করার চেষ্টা করছে সরকার। এর ফলে এই খাত থেকে করপোরেট কর আদায়ের হারও বাড়বে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিশদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
আয়ের পথে বড় বাধা খেলাপি ঋণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতে আয়ের পথে এখন প্রথম বাধা অতি উচ্চখেলাপি ঋণ। যা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জুন শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এর ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৩২.৭৮ শতাংশই শ্রেণিকৃত খেলাপি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এই হার ৪৭.৩০ শতাংশ। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ৭৫ শতাংশ। অন্য কোনো ব্যাংক হলে তা অনেক আগেই ‘ধসে’ যেত। সরকারি ব্যাংক বলে টিকে আছে। ব্যাংকের এসব ঋণ থেকে সুদ আসে না, উল্টো সঞ্চিতি (খেলাপি ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ) রাখতে হয়। ফলে ব্যাংকগুলোর আয় কমে যায়। খাতটিতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতির ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে অনেক ব্যাংকের মুনাফা ক্ষয় হচ্ছে। এ কারণে ২২টি ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে চলছে, যার মোট পরিমাণ ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।
মূলধন পরিস্থিতিও দুর্বল। মার্চ শেষে ১৫টি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক। সামগ্রিকভাবে খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ৩.১৭ শতাংশ। দুর্বল মূলধনের ব্যাংক নতুন ঋণ দিতে পারে না, ফলে আয়ের নতুন উৎসও তৈরি হয় না।
ঋণ আদায়ে তিন স্তরের পরিকল্পনা
এখন আয় ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। স্বল্পমেয়াদে এক বছরের মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণের ব্যাংকগুলোর সিনিয়র ব্যবস্থাপনার সাথে ত্রৈমাসিক আলোচনা হবে। প্রতিটি ব্যাংকের পর্ষদ সভায় শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণ আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা হবে।
মধ্যমেয়াদে আইএফআরএস ৯ অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতির ভিত্তিতে ঋণ শ্রেণিকরণ ও সঞ্চিতি নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে ঋণ পরিশোধকারীদের উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা নীতিমালা তৈরি হবে। ভালো ঋণগ্রহীতাদের পুরস্কৃত করার বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি সংস্কার হবে। ১ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে পারপেচুয়াল বন্ড ছেড়ে তহবিল সংগ্রহের নির্দেশনা আসবে। বেসরকারি খাতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (এএমসি) গঠনের আইনও হবে।
আইনি কাঠামো নতুন করে সাজানো হচ্ছে
আয় বৃদ্ধির জন্য আদায় প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করতে চারটি আইন নিয়ে কাজ চলছে।
ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৬ : ব্যাংকিং খাতে করপোরেট সুশাসন জোরদার করা এর লক্ষ্য। খসড়া গত ২৪ আগস্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে ২০ সেপ্টেম্বর।
অর্থঋণ আদালত (সংশোধন) আইন, ২০২৬ : ২০০৩ সালের আইন আধুনিকায়নের মাধ্যমে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে। খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
ডিসট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৬ : খেলাপি ঋণ আদায়ের নতুন কাঠামো দাঁড় করাতে একটি কমিটি কাজ করছে।
ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্টসি অ্যাক্ট, ২০২৬ : ১৯৯৭ সালের আইন হালনাগাদ হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেউলিয়াত্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা হবে।
নীতি সহায়তা ও পুনর্গঠন
সমস্যাগ্রস্ত ব্যবসা পুনরুদ্ধারে প্রায় ৩০০টি গ্রুপকে নীতি সহায়তা দেয়া হয়েছে। এ জন্য ৫২টি ত্রিপক্ষীয় সভা হয়েছে। এই সুবিধা পেতে নতুন আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল। কার্যক্রম ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে হবে বলে সয়মসীমাও বেঁধে দেয়া হয়েছে।
দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬-এর আওতায় পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংকের দায় ও সম্পদ নতুন গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সাথে আমানত সুরক্ষার সীমা ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। এতে আমানতকারীদের আস্থা ফেরার পথ তৈরি হচ্ছে।
জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (আরবিএস) চালু হয়েছে। এর আওতায় ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ মূল্যায়ন করে ঝুঁকি রেটিং দেয়া হবে। ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে। এ সময়ে কিছু সূচকে উন্নতিও হয়েছে। গত বছরের জুনের তুলনায় শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১.৬২ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। নীতি সুদহার ১০ থেকে কমে ৯.৫০ শতাংশ হয়েছে। আন্তঃব্যাংক কল মানি রেট গত বছরের ৯.৯৪ শতাংশ থেকে নেমে ২৭ সেপ্টেম্বর ৮.৭২ শতাংশ হয়েছে। এ সময়ে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য প্রায় ৪ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে তারল্যের ঘাটতি নেই।
তবে চিত্রটি পুরোপুরি স্বস্তির নয়। গত তিন মাসে শ্রেণিকৃত ঋণ আরো প্রায় ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। মূলধন সঙ্কটে থাকা ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকারও বেশি জরুরি তারল্য সহায়তা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আইন সংস্কারের গতি ও বাস্তবায়নের দৃঢ়তার ওপরই নির্ভর করছে, ব্যাংকগুলো কত দ্রুত লোকসান কাটিয়ে মুনাফায় ফিরবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








