
- রাজশাহী-রংপুরে সব উপজেলায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন
- চার বছরে বসবে ৩৮ হাজার বিভিন্ন নলকূপ
- বরেন্দ্র অঞ্চলে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার বাহিরে ৩৬.৪ শতাংশ
এক দিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে, অন্য দিকে বাড়ছে নিরাপদ পানির সংকট। শুকনো মরশুমে পানির স্তর নেমে গেলে। নিরাপদ পানির সঙ্কট বাড়ে, ব্যাহত হয় দৈনন্দিন জীবন। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার আর পানির প্রাকৃতিক পুনর্ভরণে ঘাটতি- সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলে সুপেয় পানির সমস্যা ক্রমেই গভীর হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার বাহিরে ৩৬.৪ শতাংশ এলাকা। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় এক হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সব উপজেলায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সম্প্রসারণে এই প্রকল্পের আওতায় বসানো হবে প্রায় ৩৮ হাজার বিভিন্ন ধরনের নলকূপ। তৈরি হবে গণশৌচাগার এবং উন্নত করা হবে স্যানিটেশন ব্যবস্থা। আজ রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, সম্পূর্ণ অর্থের জোগান দেবে সরকার। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত।
পানির সঙ্কটে দ্বিতীয় ‘হটস্পট’ বরেন্দ্র
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবনা নথির তথ্য বলছে, বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এর প্রতিবেদনে সুপেয় পানির প্রাপ্যতার বিচারে দেশের ছয়টি অঞ্চলকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই তালিকায় বরেন্দ্র অঞ্চলের অবস্থান দ্বিতীয়। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পানির অপর্যাপ্ত পুনর্ভরণ এই অঞ্চলের সঙ্কটকে আরো তীব্র করে তুলছে। উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় শুকনো মওসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় নিরাপদ পানীয় জল এবং সেচের পানির অভাব দেখা দেয়। বর্ষায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পানির সঙ্কট পুরোপুরি কাটে না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে স্যানিটেশন সমস্যাও। বরেন্দ্র অঞ্চলে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার হার ৬৩.৬ শতাংশ। পর্যাপ্ত স্যানিটেশন না থাকায় পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব, পরিবেশদূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। কমে কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা, বাধাগ্রস্ত হয় আর্থসামাজিক উন্নয়ন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলার ১২৩টি উপজেলার মানুষের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন পরিষেবার আওতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
কোথায় কত কাজ?
সরকারি নথির তথ্য হলো, প্রকল্পের আওতায় পানির উৎস তৈরি থেকে শুরু করে শৌচাগার নির্মাণ- একাধিক ধরনের কাজের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ৫৯ হাজার ৭৭৮টি উন্নত টুইন-পিট ল্যাট্রিন নির্মাণ। পাশাপাশি স্থাপন করা হবে ৪ হাজার ৩৯৪টি কমিউনিটিভিত্তিক পানি সরবরাহ ইউনিট। নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনাও বড়। প্রকল্পের প্রস্তাবে রয়েছে ২২ হাজার ১৭৬টি অগভীর ছয় নম্বর নলকূপ এবং ৫ হাজার ৩৯৯টি অগভীর নলকূপ, যার সাথে থাকবে সাবমার্সিবল পাম্প ও জলাধার। এ ছাড়া ৪ হাজার ৮২৯টি গভীর নলকূপ এবং সাবমার্সিবল পাম্প ও জলাধারসহ আরো ১ হাজার ১১৩টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হবে। প্রকল্পের অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৬৮টি রিংওয়েল, ১ হাজার ৭৯৭টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পুকুর পুনঃখনন করে ১৬টি পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) নির্মাণ। জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য তৈরি হবে ১২৫টি গণশৌচাগার।
পুরো অর্থই সরকারি কোষাগার থেকে
স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে গত ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে এক হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ে চলতি অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য একনেকের অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬-এর চতুর্থ অধ্যায়ে নগরায়ন ও আবাসনসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির সাথে প্রকল্পটির সামঞ্জস্য রয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ইশতেহারের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আধুনিক ও নিরাপদ জনপদ গড়ে তোলার লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার পরিধি বাড়বে বলে আশা করছে পরিকল্পনা কমিশন। তবে পানির সঙ্কট মোকাবেলায় শুধু নতুন অবকাঠামো তৈরি নয়, সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় এই প্রকল্প কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, তা নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা এবং তৈরি হওয়া পরিষেবাগুলো সচল রাখার ওপর।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








