ধানক্ষেতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ধানক্ষেত্রে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন এক কৃষক : নয়া দিগন্ত।

এম এ রহিম চৌগাছা (যশোর)
যশোরের চৌগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ধানখেতে ঘন ঘন কীটনাশক প্রয়োগের কারণে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র গন্ধ। এতে কৃষিজমির আশপাশের বাসিন্দা ও পথচারীদের মধ্যে অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কৃষকদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে ধানখেতে পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ফলন রক্ষায় তারা বালাইনাশক প্রয়োগ করছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহার জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সকাল ও বিকেলে কৃষকদের ধানক্ষেতে বালাইনাশক প্রয়োগ করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব জমির পাশ দিয়ে চলাচলের সময় অনেককে নাক-মুখ ঢেকে চলতে হয়। বিশেষ করে কৃষিজমিসংলগ্ন বাড়িঘর ও সড়কে কীটনাশকের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। আন্দারকোটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, ধানক্ষেতে পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়ায় কৃষকদের অনেকে ঘন ঘন বালাইনাশক প্রয়োগ করছেন। এতে আশপাশের এলাকায় তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
মৃধাপাড়া মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক ড. আব্দুস শুকুর বলেন, কীটনাশকের গন্ধে শিশু, বয়স্ক ও পথচারীদের অস্বস্তি হচ্ছে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিতভাবে এসব রাসায়নিক ব্যবহারের পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
চৌগাছা কামিল মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. আলা উদ্দীন বলেন, ফসলের পোকা দমন জরুরি হলেও অতিরিক্ত মাত্রায় বালাইনাশক প্রয়োগ সমাধান নয়। নির্ধারিত মাত্রা, উপযুক্ত সময় ও সঠিক পদ্ধতি অনুসরণের বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা প্রয়োজন।
উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের কৃষক সোলাইমান হোসেন ও আবু তালেব জানান, কীটনাশক প্রয়োগের সময় মাঝেমধ্যে হাত, চোখ ও মুখে জ্বালাপোড়া হয়। পানি দিয়ে ধুয়ে নিলে তা কমে যায় বলে তাদের দাবি। তবে এ ধরনের উপসর্গকে অবহেলা না করার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অন্য দিকে কৃষকেরা বলছেন, ধান রোপণের প্রায় ৪০ দিন পর থেকে জমির অবস্থা ও পোকার আক্রমণ বিবেচনায় বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হয়। স্বরূপদাহ গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম জানান, জমিভেদে কেউ সপ্তাহে একবার, আবার কেউ দুই সপ্তাহে একবার বালাইনাশক প্রয়োগ করেন। সময়মতো পোকা দমন করা না গেলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চৌগাছা বাজারের কীটনাশক ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলাম ও পুড়াপাড়া বাজারের শ্যামল বিশ্বাস বলেন, কৃষকদের বালাইনাশক ব্যবহারের নিয়ম ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা সম্পর্কে পরামর্শ দেয়া হয়। পণ্যের মোড়কেও প্রয়োগবিধি উল্লেখ থাকে।
চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হুসাইন বলেন, ধানখেতে মাজরা পোকাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ হতে পারে। তবে পোকা দেখা দিলেই অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করা উচিত নয়। জমির অবস্থা ও পোকার উপস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকদের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। জৈব বালাইনাশক, আলোক ফাঁদসহ পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রয়োজন ছাড়া বারবার বালাইনাশক প্রয়োগ না করে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চৌগাছা উপজেলা সরকারি মডেল হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানুল মিজান রুমি বলেন, কীটনাশকের সরাসরি সংস্পর্শে আসা কিংবা শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই প্রয়োগকারীদের সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার, অনুমোদিত বালাইনাশক নির্ধারিত মাত্রায় প্রয়োগ এবং আশপাশের মানুষকে দূরে রাখার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
স্থানীয়দের দাবি, রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, জৈবিক পদ্ধতি ও আলোক ফাঁদের মতো পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হোক।

Advertisement