
বিশেষ সংবাদদাতা
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় হিসাবের খাতভিত্তিক চিত্রে বড় বার্তা হলো- অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, কিন্তু সেই পুনরুদ্ধার এখনো সমানভাবে বিস্তৃত নয়। অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি শক্তিশালীভাবে ফিরে এলেও কৃষির গতি কমেছে, সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে এবং আর্থিক খাতের প্রবৃদ্ধি শেষ প্রান্তিকে ঋণাত্মক হয়েছে। একই সাথে জাতীয় উৎপাদনে সেবা খাতের বড় অংশীদারত্ব বজায় থাকলেও শিল্পের অভ্যন্তরে উৎপাদন, নির্মাণ, জ্বালানি ও খনিজ উপখাতের গতিপথে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সরবরাহ করা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকের সাময়িক হিসাব এবং আগের দুই অর্থবছরের তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, অর্থনীতির সামনে এখন দু’টি পৃথক চ্যালেঞ্জ : একদিকে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা, অন্য দিকে সেই প্রবৃদ্ধিকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির সাথে যুক্ত করা।
বিশ্লেষণের ভিত্তি : বিবিএসের ২০১৫-১৬ ভিত্তি বছরভিত্তিক ত্রৈমাসিক জাতীয় হিসাব, ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর। ২০২৫-২৬ সালের পরিসংখ্যান সাময়িক; এগুলোকে চূড়ান্ত বার্ষিক হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
জাতীয় হিসাবের প্রধান সূচক : কোথায় পরিবর্তন, কোথায় চাপ
চার প্রান্তিকের সম্মিলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৬৮%
বিবিএসের ত্রৈমাসিক হিসাবের ভিত্তিতে
চতুর্থ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ৪.৬০%
আগের বছরের একই প্রান্তিকে ২.০৫%
শিল্পের চতুর্থ প্রান্তিক প্রবৃদ্ধি ৬.৫২%
আগের বছর ০.৯২%
কৃষির চতুর্থ প্রান্তিক প্রবৃদ্ধি ১.৭৩%
আগের বছর ৩.১৯%
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৪.৯৬, ৩.০৩ ও ২.২২ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের শুরুতে তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থান থেকে অর্থনীতি মাঝপথে ধীর হয়েছে, তারপর শেষ প্রান্তিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শিল্পের আকস্মিক পুনরুদ্ধার এ ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান ব্যাখ্যা; তবে এক প্রান্তিকের ফলাফল দিয়ে গোটা অর্থনীতির স্থায়ী পুনরুদ্ধার নিশ্চিত বলা যায় না।
এখানে একটি পরিসংখ্যানগত সতর্কতা জরুরি। বিবিএসের জুন ২০২৬-এ প্রকাশিত সাময়িক বার্ষিক হিসাবের সংবাদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশ বলা হয়েছিল; পরবর্তী ত্রৈমাসিক হিসাবের চার প্রান্তিক মিলিয়ে হার দাঁড়িয়েছে ৩.৬৮ শতাংশ।
তাই দুই সংখ্যাকে একই হিসাবের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিবেদনে ত্রৈমাসিক হিসাবের ৩.৬৮ শতাংশকে বিশ্লেষণের ভিত্তি ধরা হয়েছে; চূড়ান্ত বার্ষিক হিসাব ও সংশোধিত তথ্য প্রকাশিত হলে ব্যবধানের কারণ যাচাই করা প্রয়োজন।
১. জিডিপিতে খাতগুলোর অংশীদারত্ব : সেবা এগিয়ে, শিল্পের পুনরুদ্ধার সীমিত
২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে চলতি মূল্যে জিডিপিতে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের অংশীদারত্ব আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় খুব বেশি বদলায়নি। তবে স্থির মূল্যের হিসাব দেখায়, শিল্পের অংশ কিছুটা বেড়েছে, কৃষি ও সেবার অংশ কমেছে।
উৎস : বিবিএসের ত্রৈমাসিক জাতীয় হিসাব; ২০১৫-১৬ ভিত্তিবছর।
এই তুলনায় তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
* সেবা খাত : অংশীদারত্ব ৫২.৯৮ থেকে ৫২.৭৬ শতাংশে নেমেছে; তবু এটি অর্থনীতির বৃহত্তম খাত।
* শিল্প খাত : অংশীদারত্ব ৩৪.১৬ থেকে ৩৪.৭৫ শতাংশে বেড়েছে। শেষ প্রান্তিকে শিল্পের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সাথে এ পরিবর্তন সামঞ্জস্যপূর্ণ।
* কৃষি খাত : অংশীদারত্ব ১২.৮৬ থেকে ১২.৪৯ শতাংশে নেমেছে। কৃষির প্রবৃদ্ধিও একই প্রান্তিকে কমেছে।
গুরুত্বপূর্ণ : এগুলো এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের স্থির মূল্যের অংশীদারত্ব, পুরো অর্থবছরের গড় নয়। স্থির মূল্যে অংশের পরিবর্তনকে সরাসরি কৃষকের আয়, শিল্পের মুনাফা বা কর্মসংস্থানের পরিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
চলতি মূল্যের হিসাবেও শিল্পের অংশ ৩২.০২ থেকে ৩২.০৮ শতাংশে এবং সেবার অংশ ৫৪.৫৬ থেকে ৫৪.৬৮ শতাংশে উঠেছে; কৃষির অংশ ১৩.৪২ থেকে ১৩.২৪ শতাংশে নেমেছে। চলতি মূল্যের এ পরিসংখ্যানে উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি মূল্য পরিবর্তনের প্রভাবও থাকে।
কৃষি : উৎপাদন বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল
কৃষির প্রবৃদ্ধি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকের ৩.১৯ শতাংশ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ১.৭৩ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি কমেছে ১.৪৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।
আগের অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কৃষির প্রবৃদ্ধি ৪.৬১ শতাংশ ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে তা ছিল ২.১১, ৩.৬৮ ও ১.৭৪ শতাংশ। শেষ প্রান্তিকের ১.৭৩ শতাংশ দেখায়, কৃষির প্রবৃদ্ধি বছরের শেষভাগে আরো দুর্বল হয়েছে।
এখানে কৃষির জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াকে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার সাথে এক করে দেখা ঠিক হবে না। উৎপাদন বাড়লেও আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধির হার কমতে পারে। ফসলের মৌসুমি চক্র, আবহাওয়া, উৎপাদন ব্যয়, সেচ, কৃষিপণ্যের দাম এবং বাজারজাতকরণের তথ্য পাশাপাশি না থাকলে এ প্রবণতার নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তবে অর্থনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট : কৃষির গতি দুর্বল হলে খাদ্য সরবরাহ, গ্রামীণ আয় ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। মূল্যস্ফীতি ও কৃষি উপকরণের ব্যয় বেশি থাকলে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের প্রকৃত আয় একই অনুপাতে বাড়বে- এমন নিশ্চয়তা নেই।
সরকারের জন্য তাই শুধু উৎপাদনের পরিমাণ নয়, ফসলভিত্তিক ফলন, কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের দক্ষতাও মূল্যায়ন করা জরুরি।
শিল্প : বছরের শেষভাগে ঘুরে দাঁড়ানো, কিন্তু পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই?
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন শিল্প খাতে। প্রথম প্রান্তিকে ৬.৮২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা ১.২৭ শতাংশে নেমে আসে। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্পের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ০.২৮ শতাংশ হলেও চতুর্থ প্রান্তিকে তা বেড়ে ৬.৫২ শতাংশ হয়েছে।
এই পুনরুদ্ধারের প্রধান চালক উৎপাদনশিল্প। চতুর্থ প্রান্তিকে উৎপাদনশিল্পের প্রবৃদ্ধি ৮.৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। আগের বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৩.২৮ শতাংশ। কিন্তু শিল্পের অন্যান্য উপখাতের তথ্য দেখায়, সবখানে সমান উন্নতি হয়নি।
শিল্পের উপখাত ২০২৫-২৬-এর চতুর্থ প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি
উৎপাদনশিল্প ৮.৬৬%
খনি ও খনন ৬.০৩%
নির্মাণ ১.৬৯%
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ -২.৪১%
উৎস : ব্যবহারকারীর সরবরাহ করা বিবিএসের ত্রৈমাসিক হিসাব, সারণি ৬।
উৎপাদনশিল্পে উত্থান, নির্মাণে দুর্বলতা
উৎপাদনশিল্পের প্রবৃদ্ধি বাড়া ইতিবাচক। তবে এটি একা শিল্পের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রমাণ নয়। উৎপাদনের এই বৃদ্ধি কতটা রফতানিনির্ভর, কতটা অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর এবং কতটা আগের বছরের দুর্বল ভিত্তির তুলনামূলক ফল- তা জানতে পণ্যভিত্তিক উৎপাদন, রফতানি, সক্ষমতার ব্যবহার ও নতুন বিনিয়োগের তথ্য দরকার।
নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১.৬৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই প্রান্তিকে এ হার ছিল ঋণাত্মক ৪.৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ নির্মাণ খাত সংকোচন থেকে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরলেও পুনরুদ্ধার এখনো দুর্বল। নির্মাণে গতি কম থাকলে আবাসন, সিমেন্ট, ইস্পাত, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট শ্রমবাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।
আরো উদ্বেগজনক বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ উপখাতের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি। শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি অপরিহার্য। উৎপাদনশিল্প যখন দ্রুত বাড়ছে, অথচ এ উপখাত সঙ্কুচিত হচ্ছে, তখন সরবরাহের সক্ষমতা ও উৎপাদনের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য আছে কি না-তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। তবে জাতীয় হিসাবের এই তথ্য একা জ্বালানিসঙ্কটকে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে প্রমাণ করে না।
বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগও প্রাসঙ্গিক। সিপিডির ২০২৬ সালের মে মাসের পর্যালোচনায় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশিল্পের দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
উৎপাদনশিল্পের ভেতরেও পরিবর্তন : অংশ বাড়ছে, কিন্তু সব উপখাত সমান নয়
চলতি মূল্যে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে জিডিপিতে উৎপাদনশিল্পের অংশ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ২০.৮৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১.৬০ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে অংশীদারত্ব বেড়েছে ০.৭৫ শতাংশীয় পয়েন্ট।
একই সময়ে নির্মাণের অংশ ৮.০৮ থেকে ৭.৪৯ শতাংশে নেমেছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহের অংশ ১.৪১ থেকে ১.২৯ শতাংশে কমেছে। ফলে শিল্পের সামগ্রিক অংশীদারত্বে বড় পরিবর্তন না এলেও শিল্পের অভ্যন্তরে উৎপাদনশিল্পের ওজন বাড়ছে, আর নির্মাণ ও জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট উপখাতের ওজন কমছে।
এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক শিল্পায়নের সম্ভাব্য ইঙ্গিত বলা যায়, তবে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়। চলতি মূল্যের অংশীদারত্ব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি বা মূল্যহ্রাসেও বদলে যেতে পারে। উৎপাদনের প্রকৃত পরিমাণ, মূল্য সংযোজন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ একসাথে না দেখলে শিল্পের কাঠামোগত রূপান্তর কতটা গভীর, তা নির্ধারণ করা যাবে না।
সেবা খাত : সবচেয়ে বড় খাত, কিন্তু প্রবৃদ্ধির ভেতরে ভিন্ন চিত্র
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সেবা খাতের অংশ সবচেয়ে বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে স্থির মূল্যে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.২৮ শতাংশ; আগের বছরের একই প্রান্তিকে ছিল ২.২৬ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে সেবার প্রবৃদ্ধি ৪.৫১, ৪.৪৫ ও ৩.৫২ শতাংশে নেমে এসেছিল। শেষ প্রান্তিকে উন্নতি হলেও বছরজুড়ে গতি একরকম ছিল না।
সেবা খাতের উপখাতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
উপখাত চতুর্থ প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি
পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য ৪.৮৭%
পরিবহন, আবাসন, খাদ্যসেবা ও তথ্য-যোগাযোগ ৩.৪৩%
আর্থিক ও বীমা কার্যক্রম -০.২৫%
আবাসন, পেশাগত, প্রশাসনিক ও সহায়ক সেবা ২.৭০%
জনপ্রশাসন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ৭.৭৩%
বিনোদন ও অন্যান্য সেবা ১.৮৬%
উৎস : বিবিএসের সারণি ৬; প্রবৃদ্ধি স্থির মূল্যে বছরওয়ারি পরিবর্তন।
এখানে দু’টি প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
প্রথমত, বাণিজ্য ও পরিবহন বাড়লেও আর্থিক খাতের গতি দুর্বল। পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ৪.৮৭ শতাংশ হলেও পরিবহন, আবাসন, খাদ্যসেবা ও তথ্য-যোগাযোগের সম্মিলিত উপখাতে তা ৩.৪৩ শতাংশ। অন্য দিকে আর্থিক ও বীমা কার্যক্রমে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ০.২৫ শতাংশ; আগের বছরের একই সময়ে এই হার ছিল ২.৬৪ শতাংশ।
আর্থিক খাতের এ দুর্বলতা তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থনীতির উৎপাদন, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ, সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। তবে জিডিপির এই একটি সূচক দিয়ে ব্যাংকিং খাতের সঙ্কটের কারণ বা গভীরতা নির্ধারণ করা যাবে না। ঋণপ্রবাহ, খেলাপি ঋণ, সুদের হার ও বেসরকারি বিনিয়োগের তথ্যের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জনপ্রশাসন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা উপখাতের প্রবৃদ্ধি বেশি। এ খাতে ৭.৭৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা সেবা খাতের গড়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু উপখাতটি একাধিক কার্যক্রমের সমন্বয়ে গঠিত। তাই এ প্রবৃদ্ধি থেকে আলাদাভাবে স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষার মান, জনসাধারণের প্রাপ্ত সুবিধা কিংবা সরকারি সেবার উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেয়া যায় না।
সেবা খাতের বড় অংশীদারত্ব অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিফলন। কিন্তু বাণিজ্য, প্রশাসন ও অন্যান্য সেবার প্রবৃদ্ধি যদি উচ্চ উৎপাদনশীলতার কর্মসংস্থান এবং দক্ষতাভিত্তিক কার্যক্রমে রূপ না নেয়, তাহলে সামগ্রিক জিডিপি বাড়লেও মানুষের জীবনমানের উন্নতি সীমিত থাকতে পারে।
জাতীয় হিসাবের পরিবর্তন কী বলছে?
বিবিএসের উপাত্ত থেকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়।
এক. প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার হয়েছে, কিন্তু বছরজুড়ে তা স্থিতিশীল ছিল না। প্রথম প্রান্তিকের ৪.৯৬ শতাংশ থেকে তৃতীয় প্রান্তিকে ২.২২ শতাংশে নেমে আসার পর চতুর্থ প্রান্তিকে ৪.৬০ শতাংশে ওঠা অর্থনীতির অসম গতিপথ তুলে ধরে।
দুই. উৎপাদনশিল্প প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালক হয়ে উঠেছে। শেষ প্রান্তিকে উৎপাদনশিল্পের ৮.৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং স্থির মূল্যে জিডিপিতে এর অংশীদারত্ব বৃদ্ধি শিল্পায়নের পক্ষে ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে ধারাবাহিক উৎপাদন ও বিনিয়োগের তথ্য দিয়ে তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিন. কৃষির গতি দুর্বল। কৃষির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণ শনাক্তে উৎপাদন, আবহাওয়া, কৃষি উপকরণ, বাজারদর ও কৃষকের প্রকৃত আয় নিয়ে আলাদা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
চার. সেবা খাতের আকার বড় হলেও সব উপখাত সমান শক্তিশালী নয়। বাণিজ্য ও জনপ্রশাসন-স্বাস্থ্য-শিক্ষা উপখাতে তুলনামূলক বেশি প্রবৃদ্ধির বিপরীতে আর্থিক কার্যক্রম ও আবাসন-পেশাগত সেবায় দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।
পাঁচ. প্রবৃদ্ধির গুণগত মান এখন মূল প্রশ্ন। জিডিপি বাড়ার সাথে কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি, উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ এবং পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে কি না, তা যাচাই ছাড়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে পূর্ণাঙ্গ বলা যাবে না। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনাগুলোতেও দুর্বল বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি ও প্রকৃত আয়ের চাপের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের সামনে অগ্রাধিকার
জাতীয় হিসাবের এই প্রবণতার ভিত্তিতে চারটি ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া দরকার।
* শিল্পে ধারাবাহিকতা : উৎপাদনশিল্পের পুনরুদ্ধার টেকসই করতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, কার্যকর ঋণপ্রবাহ, নতুন বিনিয়োগ এবং রফতানির বহুমুখীকরণ জরুরি।
* কৃষির উৎপাদনশীলতা : কৃষি উপকরণের ব্যয়, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, ফসলের ন্যায্যমূল্য এবং আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
* সেবা খাতের দক্ষতা : আর্থিক সেবা, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি ও পেশাগত সেবায় উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
* প্রবৃদ্ধির সুফল যাচাই : জাতীয় হিসাবের সাথে কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি, পরিবারের ব্যয়, বিনিয়োগ এবং শিল্পভিত্তিক উৎপাদনের তথ্য নিয়মিতভাবে মিলিয়ে দেখতে হবে।
প্রবৃদ্ধির হার নয়, অর্থনীতির ভিত কতটা শক্ত হলো?
২০২৫-২৬ অর্থবছরের ত্রৈমাসিক জাতীয় হিসাব বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরে। শেষ প্রান্তিকে শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে; উৎপাদনশিল্পের অংশীদারত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে কৃষির প্রবৃদ্ধি কমেছে, নির্মাণের গতি দুর্বল এবং আর্থিক ও জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট উপখাতে চাপ দেখা যাচ্ছে।
সুতরাং, অর্থনীতির সামনে এখন শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নয়; বরং প্রবৃদ্ধিকে স্থিতিশীল, উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থানমুখী করার চ্যালেঞ্জ। শিল্পের পুনরুদ্ধার যদি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে রূপ নেয়, কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং সেবা খাতে দক্ষতা ও আর্থিক সক্ষমতা ফিরে আসে, তবেই এই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








