ভার্চুয়াল মোহের ফাঁদে ঘরছাড়া কিশোর-কিশোরী
  •  অনলাইন আসক্তিতে ভেঙে পড়ছে পারিবারিক বন্ধন
  •  নিখোঁজের ৯৭ শতাংশই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী@ ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের তাগিদ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের

গত ১৯ অক্টোবর মধ্যরাতে পর্যটন শহর কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার একটি হোটেল ও রিসোর্ট থেকে পুলিশ ট্র্যাকিং চালিয়ে উদ্ধার করা হয় মুন্সীগঞ্জ থেকে নিখোঁজ হওয়া তিন স্কুলশিক্ষার্থীকে। পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, স্যোশাল মিডিয়া অ্যাপ ‘টিকটক’ এবং অনলাইন গেম ‘ফ্রি ফায়ারে’র প্রতি তীব্র আকর্ষণ ও অনলাইনের বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই পরিবারকে না জানিয়ে একযোগে ঘর ছেড়েছিল তারা। 
এ ছাড়াও গত ৬ অক্টোবর পরিবারকে বান্ধবীর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন কুমিল্লার জান্নাতুল তাজমিন। কিন্তু ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে পরিচিত হওয়া প্রেমিক রাজুর সাথে দেখা করতে কুমিল্লা থেকে চলেন যান কক্সবাজারের উদ্দেশে। পরদিন রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে পৌঁছানোর পর বাড়িতে ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকের পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।
একই মাসে টিকটকে পরিচয় হওয়া তরুণদের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্নে ঘর ছাড়ে কুমিল্লার তিন স্কুলছাত্রী এবং তাদের একজনের ৮ বছর  বয়সী ছোট বোন। কুমিল্লা থেকে ঢাকা হয়ে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এলাকায় পৌঁছালে এক অটোরিকশাচালকের সন্দেহ হয়। স্থানীয় পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে তাদের উদ্ধার করে। এ ছাড়াও গত আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি গড়ে তুলে ও অনলাইনে রাতারাতি ‘ভাইরাল’ কনটেন্ট ক্রিয়েটর বানিয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে এক কনটেন্ট নির্মাতার বিরুদ্ধে। পরে পুলিশ ওই অভিযুক্ত কনটেন্ট নির্মাতাকে গ্রেফতার করে। 
শুধু এসব ঘটনাই নয়, দেশজুড়ে কিশোর-কিশোরীদের ঘরছাড়ার চিত্র দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের উঠতি বয়সের কিশোরদের অনলাইন জগৎ, অসচেতন বন্ধু নির্বাচন, ভার্চুয়াল জীবনের ফ্যান্টাসি এবং পারিবারিক নজরদারির সীমারেখা নিয়ে এক বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। ভার্চুয়াল দুনিয়ার অলীক টান কিশোর-কিরোরীদেরকে বাস্তব জীবনের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে।
অনলাইন আসক্তি ও কিশোরদের ঘরছাড়ার প্রবণতার ভয়াবহতা বুঝতে পুলিশ সদর দফতরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে দেশে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু-কিশোর নিখোঁজের ঘটনায় সর্বমোট ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত হয়েছে। নথিভুক্ত জিডির মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারে ফিরে এসেছে। পরিসংখ্যানের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো, নিখোঁজসংক্রান্ত মোট জিডির প্রায় ৯৭ শতাংশই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে। 
পুলিশের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের হারিয়ে যাওয়ার পেছনে পথ ভুল করা বা নিজেদের পরিচয় সঠিকভাবে জানাতে না পারার মতো কারণ থাকে। কিন্তু ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ঘরছাড়ার পেছনে লুকিয়ে থাকে অভিমান, পড়াশোনার মানসিক চাপ, পারিবারিক কলহ, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের ফ্যান্টাসি এবং সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে অনলাইন বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রলোভন ও প্রভাব। এ ছাড়াও ২০২৩ সালে ১৭ হাজার ৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪টি এবং ২০২৫ সালে শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছিল ২২ হাজার ৫৫০টি। 
সেজ জার্নালস কুড়িগ্রাম জেলার এক হাজার ১৮৩ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, টিকিটক ও ফেসবুকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের সাথে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি, পারিবারিক যোগাযোগের দূরত্ব এবং সহপাঠীদের নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি যুক্ত। ইউনিসেফের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের প্রায় ১৩ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে সাইবার বুলিং ও হয়রানির মুখোমুখি। আর অপরাধের ভয়ে বা লোকলজ্জার আশঙ্কায় তারা পরিবারকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি থেকে পালানোর পথ বেছে নেয়।
অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সন্তানরা দিন-রাত গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকছে। এর ফলে পড়াশোনা, ঘুম ও দৈনন্দিন দায়িত্ব মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ডিভাইসে অতিরিক্ত সময় কাটানো নিয়ে বারণ করলে কিংবা ফোন কেড়ে নিতে গেলে সন্তানরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে, খিটখিটে মেজাজ দেখায় এবং অবাধ্য আচরণ করে বসে। ঘরের মধ্যে থেকেও তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। বাস্তবজীবনের বন্ধন বা বাবা-মায়ের সাথে কথা বলার চেয়ে তারা স্ক্রিনের দুনিয়া ও ভার্চুয়াল বন্ধুদের বেশি প্রাধান্য দেয়। অনলাইনে অচেনা ব্যক্তিদের সাথে পরিচিতি, অনৈতিক প্রলোভন, সাইবার গ্রুমিং ও ফ্যান্টাসির ফাঁদে পড়ে সন্তানরা প্রতারিত হতে পারে- এ নিয়ে অভিভাবকেরা তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। 
এই বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডাক্তার মোহাম্মদ শামসুল আহসান মাকসুদ নয়া দিগন্তকে বলেন, আগের দিনের মতো এখন আর গ্যাজেটহীন পারিবারিক সামাজিক পরিবেশ নেই। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তারা সংস্কৃতির নানা বার্তা পাচ্ছে, যা অনেক সময় তাদের নিজস্ব বা স্থানীয় মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাবা-মা যখন নিজেদের পারম্পরিক মূল্যবোধ সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন, তখন সন্তান ইন্টারনেটে দেখা জগতের সাথে বাস্তবতার অমিল খুঁজে পায় এবং এক ধরনের মানসিক দ্বন্দ্ব ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
তিনি আরো বলেন, কৈশোরে পা দেয়ার সাথে সাথে বেশ কিছু বায়োলজিক্যাল বা হরমোনজনিত পরিবর্তন আসে। যা তাদের অ্যাগ্রেসিভ বা আক্রমণাত্মক করে তোলে এবং নতুন জিনিস জানার কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। এই বয়সে প্রথাগত সামাজিক নিয়মকানুনের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করতে চায় এবং পরিবার অপেক্ষা বন্ধু-বান্ধবকে বেশি প্রাধান্য দেয়। বাবা-মায়ের চিন্তাভাবনার সাথে সন্তানের এই চিন্তার ফারাক থেকেই মূলত প্রজন্মগত দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্বের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আসা বিভিন্ন কাল্পনিক প্রলোভন ও অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে যোগসূত্র তৈরি হয়, যার রিয়েল ও ফেক সত্তা বিচারে কিশোররা প্রায়ই ভুল করে ফেলে।
সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলোর প্রযুক্তিগত কাঠামোর সমালোচনা করে ড. মাকসুদ বলেন, এই প্ল্যাটফর্মগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ইচ্ছাকৃতভাবে আসক্ত করে রাখে। এভাবে যুবসমাজকে অনাকাক্সিক্ষত ও আপত্তিকর কন্টেন্টের দিকে ধাবিত করে মানসিকভাবে এনগেজ বা বন্দী করে ফেলা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ভয়াবহ ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে অস্ট্রেলিয়া বা ফ্রান্সের মতো বাংলাদেশেও জরিপের ভিত্তিতে ১৬ বছর বা তার কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আইনি নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ আনা প্রয়োজন।
ড. মাকসুদের মতে, বাংলাদেশের নিজস্ব সমাজব্যবস্থার আলোকে সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় পরিবার ও তরুণদের জন্য একটি সুস্পষ্ট আচরণগত মানদণ্ড নির্ধারণ করা জরুরি। বিশেষ করে প্রতিটি পরিবারে সুনির্দিষ্ট সীমানা ও ধর্মীয়-সামাজিক মূল্যবোধ চর্চার মধ্য দিয়েই কেবল তরুণ প্রজন্মকে এই বিভ্রান্তি ও অনাকাক্সিক্ষত বিপদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

Advertisement