
এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে কিছু প্রভাব পড়তে পারে, ব্যবসা সঙ্কুচিত হয়ে যেতে পারে। আবার সর্বক্ষেত্রেই অসুবিধা হতে পারে এমন নাও ঘটতে পারে, কিছু সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত হতে পারে। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে কী প্রভাব পড়তে পারে এমন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সাবেক শিক্ষক, সাবেক ডিন, প্রফেসর অ্যামেরিটাস অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নয়া দিগন্তের বিশেষ সংবাদদাতা হামিম উল কবির।
নয়া দিগন্ত : এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের সুবিধা কী হতে পারে ?
অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান : বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের জন্য স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ একটি বড় অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিবর্তন। এর প্রভাব পড়বে ওষুধের রফতানি ও কাঁচামাল আমদানিতে, মেধাস্বত্ব আইনে, উৎপাদন ব্যয়ে এবং সর্বোপরি ওষুধের দাম এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ওপরও প্রভাবটা পড়তে পারে। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ এক দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ওষুধ রফতানিতে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে, অন্য দিকে গবেষণা, নতুন ওষুধ উদ্ভাবন ও নিজস্ব কাঁচামাল উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোরও সুযোগ ঘটতে পারে। তবে এলডিসি উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশের ওষুধের সব সুবিধা একসাথে শেষ হয়ে যাবে না। কোন সুবিধা কখন বন্ধ হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তি, উত্তরণ-পরবর্তী সময়সীমা এবং রফতানিকারক দেশের বাণিজ্যনীতির ওপর। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের জন্য সম্ভাব্য প্রধান অসুবিধা হচ্ছে ওষুধের মেধাস্বত্ব ও পেটেন্টের সুবিধা হারানোর ঝুঁকি। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মেধাস্বত্ববিষয়ক চুক্তি, অর্থাৎ ট্রিপসের আওতায় ওষুধের পেটেন্ট সংক্রান্ত কিছু বাধ্যবাধকতা থেকে বিশেষ ছাড় পেয়ে এসেছে। এর ফলে বিদেশে সর্বশেষ উদ্ভাবিত অনেক ওষুধের পেটেন্ট সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও কোনো বাধা ছাড়াই বাংলাদেশী কোম্পানিগুলো ওই ওষুধের জেনেরিক ওষুধ তৈরি করতে পারছে ।
নয়া দিগন্ত : এলডিসি থেকে উত্তরণের পর প্রযোজ্য ছাড় শেষ হলে কী হবে?
অধ্যাপক মাহমুদ হাসান : পেটেন্ট সুরক্ষিত ওষুধ উৎপাদনে লাইসেন্স বা পেটেন্টধারীর অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে। অনুমতি নেয়া মানে বিদেশী কোম্পানিকে রয়্যালটি দিতে হবে, ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। এ ছাড়া নতুন ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ তৈরি ও বাজারজাত করার সময়সীমার মধ্যে আসতে কিছু সময় লাগবে। নতুন ওষুধ কোম্পানির ওষুধ উৎপাদন করতে অনুমতি নিতে না পারলে বিদেশী ওষুধ দেশীয় বাজারে ঢুকে যেতে পারে। ফলে দেশীয় ওষুধ কোম্পানির বাজার বিদেশীদের হাতে চলে যেতে পারে। এর বাইরে ছোট ও মাঝারি ওষুধ কোম্পানির জন্য গবেষণা, লাইসেন্স এবং আইনি ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য আছে : ডব্লিউটিওর সিদ্ধান্তে সাধারণ ট্রিপস বাধ্যবাধকতা থেকে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ছাড় ১ জুলাই ২০৩৪ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল; কিন্তু ওষুধের পেটেন্টসংক্রান্ত নির্দিষ্ট ছাড়ের সময়সীমা আলাদা। সেটি ১ জানুয়ারি ২০৩৩ পর্যন্ত অথবা সংশ্লিষ্ট দেশ এলডিসি মর্যাদা হারানো পর্যন্ত- যেটি আগে ঘটবে সেটাই প্রযোজ্য হবে। ফলে বাংলাদেশের উত্তরণের ক্ষেত্রে কোন ছাড় কত দিন কার্যকর থাকবে, তা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
নয়া দিগন্ত : ইউরোপসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারে রফতানির শুল্কসুবিধা কি কমে যাবে তখন ?
অধ্যাপক মাহমুদ হাসান : বাংলাদেশের ওষুধ রফতানিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার গুরুত্বপূর্ণ। এলডিসি হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) ব্যবস্থায় বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়ে আসছে, সেটা হয়তো তখন নাও থাকতে পারে।
নয়া দিগন্ত : এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে সম্ভাব্য প্রভাবগুলো কী হতে পারে ?
অধ্যাপক মাহমুদ হাসান : ভারত, চীন ও অন্যান্য দেশের উৎপাদকদের সাথে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের দামের সুবিধা কমতে পারে। আমদানিকারকদের কাছে বাংলাদেশের ওষুধের চূড়ান্ত মূল্য বেড়ে যেতে পারে। রফতানিকারকদের মুনাফার হার কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে শুল্কসুবিধা হারানোর অর্থ হলো- সব বাজারে একই দিনে সব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন জিএসপি ব্যবস্থায় ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত দেশগুলোকে অন্তত ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত ইবিএ সুবিধা অব্যাহত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য উত্তরণের সময়সূচি ও কোনো স্থগিতাদেশের সিদ্ধান্তও বিবেচনায় নিতে হবে।
নয়া দিগন্ত : দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ওষুধের দাম বাড়ার সম্ভাবনা কতটুকু ?
অধ্যাপক মাহমুদ হাসান : পেটেন্ট সুরক্ষা, লাইসেন্স ফি এবং নতুন কাঁচামাল বা উৎপাদনপ্রযুক্তি সংগ্রহের ব্যয় বাড়লে কিছু ওষুধের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে। বিশেষ করে নতুন, পেটেন্ট সুরক্ষিত ওষুধের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি হতে পারে। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির ওষুধ কেনার ব্যয় বাড়তে পারে। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের রোগীদের জন্য কিছু চিকিৎসা ব্যয়বহুল হয়ে যেতে পারে। তবে সব ওষুধের দাম বাড়বে- এমন নাও হতে পারে। যেসব ওষুধের পেটেন্ট নেই (অর্থাৎ পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে) সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক জেনেরিক উৎপাদন অব্যাহত থাকবে। দাম কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে নির্দিষ্ট ওষুধের পেটেন্ট, বিকল্প উৎপাদক, কাঁচামালের দাম, সরকারি মূল্যনীতি এবং বাজার প্রতিযোগিতার ওপর।
নয়া দিগন্ত : এলডিসি উত্তরণের পর কাঁচামাল আমদানির ব্যয় ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ কতটুকু পড়তে পারে ?
অধ্যাপক মাহমুদ হাসান : বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প সক্রিয় ওষুধ উপাদান (এপিআই) আমদানির ওপর নির্ভরশীল, এখানে খুব সামান্য পরিমাণ এপিআই উৎপাদন হয়। এলডিসি উত্তরণের পর আমদানি শুল্কের এটি ব্যাপারে থাকবে। এটাও ঠিক যে, এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে নিজে থেকেই সব এপিআইয়ের আমদানি শুল্ক বেড়ে যাবে না। তবে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যসুবিধা, শুল্কনীতি ও সরকারি প্রণোদনায় পরিবর্তন হলে উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানি আমদানিনির্ভর কাঁচামাল ব্যবহার করে, কম মুনাফায় বিপুল পরিমাণ ওষুধ উৎপাদন করে, গবেষণা ও উন্নয়নে সীমিত বিনিয়োগ করে তারা তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে। এ কারণে এপিআই পার্কের সুবিধা বাড়ানো, দেশীয় কাঁচামাল উৎপাদন এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ ঘটলে কি কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে না?
অধ্যাপক মাহমুদ হাসান : এলডিসি উত্তরণকে শুধু সুবিধা হারানোর ঘটনা ভাবা পুরোপুরি ঠিক না। এভাবে চিন্তা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়াও যাবে না। সঠিক নীতিগত প্রস্তুতি থাকলে এলডিসি উত্তরণের পর শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। ওষুধের ক্ষেত্রে চিন্তা করলে এলডিসি উত্তরণ গবেষণা ও নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের পাশাপাশি বাংলাদেশী কোম্পানিগুলোকে নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি), নতুন ওষুধের ফর্মুলেশন এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করারও সুযোগ তৈরি হবে। ওষুধ শিল্পে ভালো করে টিকে থাকতে হলে এই সুযোগটি কাজে লাগাতে হবে। বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখলে এভাবে ভাবা যেতে পারে- নিজস্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হবে; জটিল ওষুধ, ক্যানসারের ওষুধ, ইনসুলিন ও জীবপ্রযুক্তিনির্ভর ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়তে পারে; আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারলে উন্নত বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে; দীর্ঘ মেয়াদে শুধু কম দামের ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তি ও গুণগত মানের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে। তবে গবেষণার ব্যয় অনেক বেশি। তাই শুধু পেটেন্ট সুরক্ষা কঠোর হলেই নতুন উদ্ভাবন বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা, দক্ষ গবেষক, পরীক্ষাগার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয় প্রয়োজন।
নয়া দিগন্ত : বিদেশী বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সম্ভাবনা কতটুকু বাড়তে পারে ?
অধ্যাপক মাহমুদ হাসান : এলডিসি উত্তরণের পর মেধাস্বত্বের সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক নিয়মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে বিদেশী কোম্পানি বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে বিনিয়োগে এগিয়েও আসতে পারে। বাড়তে পারে যৌথ উদ্যোগে ওষুধ উৎপাদন; প্রযুক্তি হস্তান্তর ও গবেষণাগার স্থাপন হতে পারে বাংলাদেশে যদি আগ্রহী উদ্যোক্তা থাকে। এতে করে উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু থাকা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে যৌথভাবে ওষুধ বাজারজাত করাও সম্ভব হবে। তবে এটাও ঠিক বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা এখনি দেয়া সম্ভব নয়। এটা নির্ভর করবে বৈশি^ক অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর। যেমন- বর্তমানে চলমান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধটা শেষ হচ্ছে না, এটা বিশ^ অর্থনীতিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে। এর ওপরই নির্ভর করবে বিদেশী বিনিয়োগ। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীরা বাজারের আকার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ জনবল, অবকাঠামো, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং মুনাফার সম্ভাবনাও বিবেচনা করবেন।
নয়া দিগন্ত : এলডিসি উত্তরণে কেউ কেউ বলছে, ‘এতে করে রফতানি বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগ আসতে’ এমন কিছু কি ঘটার সম্ভাবনা আছে ?
অধ্যাপক মাহমুদ হাসান : বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি পেয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের ওষুধের সুনাম রয়েছে। এসব অঞ্চলে আমাদের ওষুধের বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে। এখন লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত, ‘প্রচলিত জেনেরিক ওষুধের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ওষুধ ও বিশেষায়িত পণ্যের রফতানি বাড়ানো। ইনজেকশন, ইনহেলার ও জীব প্রযুক্তিনির্ভর ওষুধ ও বায়োসিমিলার ওষুধের ওপর গুরুত্ব দেয়া উচিত। এটা তখনই সম্ভব যখন আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উৎপাদন, পরীক্ষণ ও নিবন্ধন হবে।
নয়া দিগন্ত : নয়া দিগন্তকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান : নয়া দিগন্তকেও ধন্যবাদ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








