
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার চারটি আসন ডাকাতি করে জামায়াতে ইসলামীর বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আবারো নির্বাচনে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা হলে সাথে সাথে প্রতিহত করা হবে। তিনি বলেন, ঢাকাবাসীকে চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা করতে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে জনগণের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সদস্য (রুকন) সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি আরো বলেন, তিন শ’ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা জামায়াতে ইসলামী আজ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। জামায়াতে ইসলামী আজ এদেশের জনগণের আস্থাশীল একটি রাজনৈতিক আদর্শিক সংগঠন।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী কখনো ইসলাম ও মানবতার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ইসলামের নীতিমালা জামায়াতে ইসলামী অনুসরণ করে বলেই এদেশের জনগণের আস্থা তৈরি হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, শুধু একাত্তর নয়, চব্বিশ পরবর্তীও জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নানারকম ন্যারেটিভ তৈরি করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কিন্তু জনগণ কোনো ন্যারেটিভ গ্রহণ করেনি। বরং ন্যারেটিভ তৈরিকারীদের প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, যারা জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে তারা নিজেরাও নিজেদের বিরুদ্ধে ফতোয়া নাজিল করে। জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার আর মনগড়া ফতোয়া দেয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর কার্যক্রমের চেয়ে আরো ভালো কোনো কার্যক্রম যদি কেউ পরিচালনা করতে পারে তবে জামায়াতে ইসলামী তাদের বিরোধিতা না করে সহযোগিতা করবে, ইনশাআল্লাহ।
জামায়াত আমির বলেন, রাসূল সা: দু’টি যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করলেও অন্য যুদ্ধে কৌশল অবলম্বন করে বিপরীত দিক থেকে বিজয় অর্জন করেছিলেন। বিজয়ের অন্যতম শর্ত হচ্ছে কৌশল অবলম্বন করা। তিনি বলেন, রাজনৈতিক কৌশলকে তারাই গুপ্ত বলে যারা দেশের সঙ্কটকালে কৌশল অবলম্বন করতে ব্যর্থ হয়ে বিদেশে পালিয়ে যায়।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংগঠনের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি বলেন, শুধু স্লোগান দিয়ে বিপ্লব হয় না। বিপ্লবের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তিনি আরো বলেন, জুলাই পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার না করে সরকার জাতিকে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জনগণ রাজপথে নেমে আসলে পরবর্তী বিপ্লব কেউ ঠেকাতে পারবে না উল্লেখ করে তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, জনগণ রাজপথে নেমে আসার আগে গণভোটের গণরায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ তৈরি করলে সরকারই উপকৃত হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা জামায়াতে ইসলামীকে ক্ষমতায় নিতে চাই না। আমরা ইসলামের বিজয়ের জন্য জামায়াতে ইসলামীকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় চাই। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে এদেশে নামাজ কায়েম হবে, জাকাত আদায় হবে, মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে। সমাজে মাদক, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজ থাকবে না। ফলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্ববৃহৎ ইসলামী দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। জনগণ জামায়াতে ইসলামীকে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলেও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। আসন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে কোনোভাবেই ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং করতে দেয়া হবে না।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, জামায়াতে ইসলামীর জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম অব্যাহতভাবে সমাজের প্রতিটি স্তরে স্তরে পৌঁছাতে হবে। সমাজ সংস্কারের লক্ষ্য আমাদের কার্যক্রম জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। তিনি আরো বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনগণের বিজয়ের জন্য আপসহীন ভূমিকা রাখতে হবে। জনগণের বিজয় যাতে কেউ ছিনিয়ে নিতে না পারে এজন্য ঢাকাবাসীকে সাথে নিয়ে প্রস্তুত থাকতে তিনি সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাসে বর্তমান ডাকসু যেভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনগণ আমাদেরকে নির্বাচিত করলে একইভাবে নগরবাসীকে একটি আধুনিক সিটি করপোরেশন উপহার দেয়া হবে। ঢাকাকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন।
সংগঠনের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপির পরিচালনায় সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য যথাক্রমে সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, মোবারক হোসেন প্রমুখ।
জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে, কিন্তু তা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে
এর আগে একই স্থানে দলের ঢাকা মহানগরী উত্তরের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ আমাদের ঠিকই ভোট দিয়েছিল কিন্তু তা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। জনগণ আমাদের বলে, ভোট আপনাদের দিয়েছিলাম, কিন্তু আপনারা তা রক্ষা করতে পারলেন না। তখন আমাদের বলতে হয়, আমাদের দুর্বলতা ছিল।
এ সময় জামায়াত আমির বলেন, আমাদের মূল টার্গেট হলো আল্লাহর জান্নাতে যাওয়া। আমি বিশ্বাস করি, যারা দিন আনে দিন খায়, আল্লাহর পথে তাদের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ৭০ ভাগ মানুষ অংশগ্রহণ করেছে, যারা দিন আনে দিন খায়।
তিনি বলেন, আল্লাহ আমাদের যাদের সম্পদ দিয়েছেন, আমরা যেন তার নিয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করি। জান্নাতের জন্য নিজেদের ঠিকানা তৈরি করতে হবে।
জামায়াত আমির কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে রুকনদের উদ্দেশে আলোচনা করেন। এ সময় তিনি মৃত্যু ও পরকালীন জীবন নিয়েও আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, মহান আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের জন্য চোখের পানি ফেলে তার শুকরিয়া আদায় করতে হবে এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।
ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের অতীত সাংগঠনিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় দুই মহানগরীর অবস্থাই অনেক দুর্বল ছিল। আমাদের ভাই-বোনদের ত্যাগ, কুরবানি ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, আল্লাহর শুকরিয়া যে মানুষ তাদের এত ভালোবাসা দিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনে নিজেদের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা গেছে। ভবিষ্যতে যেন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যাদের প্রার্থী করা হয়েছে, তাদের মধ্যে আল্লাহর দেয়া জ্ঞানের বড় নিয়ামত রয়েছে। জনগণকে সাথে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রাচীর গড়ে তুলতে হবে। কোনো চোরকে আর ছাড় দেয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
‘আমরা থামবো না, আমাদের থামার সুযোগ নেই। সামনে সিটি নির্বাচনে আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে ও দিনরাত একাকার করে কাজ করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের ভুলগুলো নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। এবার এগুলোর আলোকে কাজ করলে আশা করি আর ভুল হবে না,’ যোগ করেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, এই দেশের জনগণই ঠিক করবে, দেশ কারা পরিচালনা করবে।
সমাজ পরিবর্তনের গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আমরা বসে বসে আর তামাশা দেখব না। আমরা সংগতভাবেই প্রতিবাদ করব এবং যেখানে আমাদের সামর্থ্য হবে, সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রুকনিয়াত কোনো পদ-পদবি নয়, এটি একটি মান। তাই এটিকে ক্ষমতা মনে করলে আমরা ভুল করব।
তিনি আরো বলেন, রুকনিয়াত হলো জীবনের নীতি-নৈতিকতার মান বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রুকন হিসেবে আমাদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। আমাদের মান-রূহানিয়াত যত শক্তিশালী হবে সংগঠন তত শক্তিশালী হবে। আগামীর মেয়র নির্বাচনে আমাদের শক্তিশালী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে আমাদের ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রমাণ দিতে হবে। তাহলে আমরা মেয়র এবং কাউন্সিলর নির্বাচনে যথাযথ সফলতা অর্জন করতে পারবো।
ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, রুকন সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি আমাদের মানের দিক থেকেও ভালো, উন্নত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে। আমরা আস্থাভাজন নেতৃত্ব গড়ে তুলব। একইসাথে একটি মজবুত সংগঠন গড়ে তোলা হবে, ইনশাআল্লাহ।
সম্মেলন দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত নির্বাচনী সেশন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৭-২০২৮ সেশনের জন্য ঢাকা মহানগরী উত্তর আমির নির্বাচনে রুকনরা ভোট দেন। নির্বাচন পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন। তাকে সহায়তা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আ: সবুর ফকির। ১৩ সহস্রাধিক সদস্য (রুকন) এতে ভোট দেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








