
শফিউল আযম বেড়া (পাবনা) ও লুৎফর রহমান তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)
চলনবিলের জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া শামুক ও ঝিনুক জীবিকা অর্জনের অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের নিম্নবিত্ত হাজারও মানুষের। এ অঞ্চলের কর্মহীন মানুষ আষাঢ় থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে সেখানে চাষ করা চিংড়ি মাছের খাবার হিসেবে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বিচারে শামুক-ঝিনুক নিধনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। কমে যাচ্ছে এই অঞ্চলের মাটির উর্বরা শক্তি। শামুক-ঝিনুক মরে গিয়ে তার মাংস ও খোলস পচে জমির মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশ তৈরি করে। এতে জমির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ ধানগাছের শিকড় মজবুত ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।
চলনবিলের ১৬টি নদী, ৩৯টি বিল ও ২২টি খাঁড়িসহ বিস্তীর্ণ জলাভূমি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ টন শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। শামুক-ঝিনুক বেচা- কেনার জন্য চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, তাড়াশ, সিংড়া উপজেলায় ৪০টির বেশি আড়ত গড়ে উঠেছে। সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে আড়তদাররা প্রতি বস্তা শামুক-ঝিনুক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন। ব্যবসায়ীরা এসব শামুক-ঝিনুক বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ঘের মালিকদের কাছে বিক্রি করছে। চিংড়িসহ চাষ করা অন্য মাছ দ্রুত বৃদ্ধিতে কম খরচে খাদ্য হিসেবে শামুক-ঝিনুকের বিকল্প নেই। তাই এর চাহিদা বেশি।
তাড়াশ উপজেলার ডাহিয়া গ্রামের কামাল মিয়া শামুক-ঝিনুক বিক্রির টাকা দিয়েই সংসার চালান। দুই ছেলে ও চার মেয়ে নিয়ে তার সংসার। তিনি নিজে ও ছেলেমেয়েরা মিলে প্রতিদিন গড়ে দুই বস্তা শামুক ধরেন। আয় হয় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। এই টাকা দিয়েই চলে তার পরিবারের খরচ। কলম গ্রামের দরিদ্র গৃহিণী আছমা বেগম। বৃদ্ধ স্বামী উপার্জনে অক্ষম। প্রতিদিন ঝুড়ি নিয়ে ধান ক্ষেত থেকে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করেন। শামুক সংগ্রহ করে নিজের পড়ালেখার খরচসহ বিভিন্ন খরচ জোগাড় করে তাড়াশ উপজেলার ভেটুয়া গ্রামের কিশোর সাইদুলও।
বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে শামুক আহরণ শুরু হয়ে চলে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত। তবে আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ মাস হচ্ছে শামুক ঝিনুক ধরার ভরা মওসুম। মাছ কমে যাওয়ায় কিছু জেলে পরিবার এ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে।
চলনবিলের নদী, বিল ও খাঁড়ির পাড়ে গড়ে উঠেছে শামুক-ঝিনুক বিক্রির অস্থায়ী বাজার। ফড়িয়ারা শামুক-ঝিনুক কিনে আড়তে বিক্রি করে। সেখান থেকে ট্রাকযোগে চলে যায় বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। এ অঞ্চলের চাটমোহর, ভাগুড়া, উল্লাপাড়া, তাড়াশ ও সিংড়ায় প্রায় ৫০টির মতো শামুক-ঝিনুক কেনাবেচার আড়ত রয়েছে। প্রধান কয়েকটি আড়ত হলো দীঘিবাজার, মহিষলুটি, ১০ নং ব্রিজ এলাকা, হান্ডিয়াল, সাগুড়া, বিয়াস বাজার, নিমাইচড়া বাজারসহ ৪০টি এলাকায় পাইকারি শামুক-ঝিনুক বেচাকেনা চলে।
সরেজমিনে মহিষলুটি, ১০ নং ব্রিজ এলাকা ও বিয়াস বাজার গিয়ে দেখা যায়, শামুক বিক্রি করতে আসা ফড়িয়া তাড়াশ উপজেলার সাতপুকুরিয়া গ্রামের বেল্লাল হোসেন বলেন, এলাকার দরিদ্র ছেলেমেয়েরা শামুক-ঝিনুক ধরে। আয়াশ গ্রামের মহাজন ছালাম মিয়া বলেন, বিভিন্ন ফড়িয়ার কাছ থেকে বস্তা হিসেবে শামুক-ঝিনুক কিনে থাকি। আজ ৩০ হাজার টাকার শামুক কিনেছি। এখন ট্রাকে করে এই শামুক খুলনা পাঠাব। তিনি বলেন, খুলনার বটতলা, রায়েরমহল, চিতলমারী, গুদারা ও আলমঘাটা এলাকায় নিয়ে গিয়ে এ শামুক-ঝিনুক বিক্রি করি। দক্ষিণাঞ্চলের লোনা পানিতে শামুক হয় না। তাই আমাদের এই অঞ্চলের শামুকের বেশ চাহিদা রয়েছে। এই শামুক ভেঙে ভেতরের অংশ বিভিন্ন খামারে মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, চলনবিল অঞ্চলের জলাভূমির শামুক-ঝিনুক অনেক কিছুরই খাবার। ব্যাপকহারে শামুক নিধন জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলাও নষ্ট করে। যে শামুকগুলো বর্ষার শেষে মাটিতে বসে তা সেখানেই পচে সার হয়। জমিতে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের জোগান দেয়। প্রতিদিন চলনবিল থেকে প্রায় ৫০ টন শামুক ধরা হচ্ছে। ফলে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো: জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, যেকোনো মৃতজীবের অবশিষ্ট অংশ পচে-গলে জৈব সার হয়। তেমনি এ অঞ্চলের শামুক শুকনো মওসুমে মাটির সাথে মিশে যায়, যা মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। আমাদের এই শামুক প্রাকৃতিক সম্পদ। নির্বিচারে শামুক নিধন নিঃসন্দেহে এ অঞ্চলের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








