মমেকে চিকিৎসাসামগ্রী ময়লার গুদামে রোগীদের কিনতে হয় বাইরে থেকে
ময়লার স্তুূপে পড়ে থাকা অব্যবহৃত সিরিঞ্জ : নয়া দিগন্ত।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম       ময়মনসিংহ

Advertisement

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। অথচ হাসপাতালে অব্যবহৃত নতুন ও প্যাকেটজাত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে নগরীর শম্ভুগঞ্জ এলাকার একটি ময়লার স্তূপে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব সামগ্রীর মেয়াদ ২০২৮ ও ২০৩১ সাল পর্যন্ত রয়েছে। হাসপাতালের ময়লার সাথে কীভাবে এসব সামগ্রী বাইরে যাচ্ছে, কারা নিচ্ছে এবং কোথায় যাচ্ছে- তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের লাখো মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল এই হাসপাতালটি। কিন্তু জীবনরক্ষাকারী ওষুধের পাশাপাশি এসব জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী, ক্যানুলা ও ইনজেকশন সিরিঞ্জ বাইরের দোকান থেকে কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। এরই মধ্যে অব্যবহৃত পণ্য ময়লার সাথে বাইরে চলে যাওয়ার এই নজিরবিহীন ঘটনায় হাসপাতালের সরবরাহ ব্যবস্থা, সংরক্ষণ প্রক্রিয়া ও তদারকি নিয়ে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
ময়লা সংগ্রহ ও বাছাইয়ের কাজের সাথে যুক্ত শ্রমিকদের দেয়া তথ্য থেকে জানা গেছে এসব ভয়াবহ চিত্র। হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা আবর্জনার মধ্য থেকে প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণে নতুন ও প্যাকেটজাত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছে। গুদামে কর্মরত ময়লা বাছাই শ্রমিক জুবেদা খাতুন জানান, ১১ জন শ্রমিকের মধ্যে চারজন সরাসরি মমেক হাসপাতাল থেকে ময়লা আনার কাজে যুক্ত। তিনি বলেন, ‘ময়লার সাথে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ একদম নতুন সিরিঞ্জ ও ক্যানুলা আসে। এগুলো বাছাই করে ১০-১২ দিন পর তিন-চারটি বড় বস্তায় ভরা হয়। এর কিছু অংশ হাসপাতালে ফেরত দেয়া হলেও একটি বড় অংশ পাইকারি বাজারে বিক্রি করে দেয়া হয়।
হাসপাতাল প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ ভ্যান ময়লা অপসারিত হয়। প্রতি সপ্তাহে এই ময়লার আড়াল থেকেই উদ্ধার হচ্ছে বস্তা বস্তা অব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রী। প্রশ্ন উঠছে, ময়লা বাইরে নেয়ার সময় কোনো যাচাই-বাছাই হয় কি না? এত বিপুল পরিমাণ জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম ট্র্যাশ ভ্যানে কীভাবে স্থান পায়? অসাধু চক্র কি তবে হাসপাতালের বিপুল পরিমাণ ওষুধ ও সরঞ্জাম ব্যবহার না দেখিয়ে ময়লার আড়ালে পাচার করছে- এমন প্রশ্ন এখন জনমনে।
হাসপাতালের এই ভয়াবহ অনিয়ম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিনিয়র স্টোর অফিসার ডা. ঝন্টু সরকার বলেন, ‘অব্যবহৃত সিরিঞ্জ বা কোনো চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে যাওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। বিষয়টির সত্যতা খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে কড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার আশরাফুল ইসলামের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য মেলেনি।
এ দিকে ঘটনাটিকে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অপরাধ আখ্যা দিয়ে ময়মনসিংহ মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘এক দিকে সাধারণ রোগীরা সেবা না পেয়ে বাইরে টাকা ঢালছেন, অন্য দিকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত মেয়াদ থাকা সরকারি মালামাল ময়লার স্তূপে ফেলা হচ্ছে। এই ঘটনায় শুধু শোকজ নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে চোরচক্র ও তদারকি কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’
সরকারি সম্পদ লুটপাট আর সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় এমন চরম অনিয়ম রুখতে হাসপাতালের ইনভেন্টরি বা মজুদ খাতা তল্লাশি ও ঘটনার পেছনের মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচনের জোরালো দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।