এলডিসি উত্তরণের কঠিন পথ

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু 

Advertisement

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে এই অর্জনের সাথে যুক্ত হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও কঠিন চ্যালেঞ্জ। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময় সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা হারানোর আশঙ্কা, রফতানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং কাঠামোগত সংস্কারের ধীরগতি নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। 
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রাক্কলন অনুযায়ী, এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজারসুবিধা হারানোর কারণে বাংলাদেশের বার্ষিক রফতানি আয় প্রায় ৬৩৮ কোটি মার্কিন ডলার বা ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। এ আশঙ্কা বাস্তবায়িত হলে দেশের রফতানিনির্ভর শিল্প, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। 
সম্প্রতি বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খানের উপস্থাপিত এক বিশ্লেষণেও উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক ঝুঁকি, বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা এবং তা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় কৌশলগত সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি উত্তরণকে টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে রূপ দিতে হলে শুধু সময়সীমা বাড়ানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়; পাশাপাশি বাড়াতে হবে উৎপাদনশীলতা, রফতানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ সমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দতা। 
উত্তরণের যোগ্যতায় সাফল্য, বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জ : জাতিসঙ্ঘের উন্নয়ননীতিসংক্রান্ত কমিটি (সিডিপি) সাধারণত তিনটি সূচকের ভিত্তিতে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের যোগ্যতা মূল্যায়ন করে। সূচকগুলো হলো মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক। 
প্রতিবেদনে  উল্লিখিত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় উত্তরণের জন্য নির্ধারিত এক হাজার ৩০৬ ডলারের সীমার বিপরীতে দুই হাজার ৭৬৫ ডলারে পৌঁছেছে। মানবসম্পদ সূচকে নির্ধারিত ৬৬ পয়েন্টের বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন ৭৮ দশমিক ১ পয়েন্ট। অন্য দিকে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে নির্ধারিত সীমা ৩২ পয়েন্টের নিচে থাকার শর্তের বিপরীতে বাংলাদেশের অবস্থান ২১ দশমিক ৭ পয়েন্ট। 
২০২১ সালের পর্যালোচনায় বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। সাধারণত উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য তিন বছর সময় দেয়া হলেও করোনাভাইরাস মহামারীর অর্থনৈতিক অভিঘাত বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল নির্ধারণ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 
তবে নির্ধারিত সূচকে সাফল্য অর্জন আর উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা সামাল দেয়া এক বিষয় নয়। আয় ও মানবসম্পদ সূচকে অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রফতানি পণ্যের সীমিত বৈচিত্র্য, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের অনিয়ম এবং বিনিয়োগের মন্থরতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। ফলে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনা জরুরি। 
শুল্কসুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে রফতানি 
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপানসহ বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা পেয়ে আসছে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার কিছু হারালে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপিত হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের দাম বাড়বে এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের পণ্যে গড়ে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৯১ ও ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং কানাডায় ১৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিশেষ করে তৈরী পোশাক খাতের রফতানি চাপে পড়তে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের বাজারেই সম্ভাব্য বার্ষিক রফতানি তির পরিমাণ প্রায় ৫২৮ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। 
এ ধরনের শুল্কবৃদ্ধি শুধু রফতানি আয় কমাবে না, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কম ব্যয়ের বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকলে বাংলাদেশের উৎপাদকদের বাজার ধরে রাখতে মূল্য, মান, সরবরাহের সময় এবং পরিবেশগত মানদণ্ডÑ সব েেত্রই বাড়তি সমতা দেখাতে হবে। 
রফতানি বহুমুখীকরণে ঘাটতি 
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ তৈরী পোশাক খাতনির্ভর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট রফতানির প্রায় ৮৫ শতাংশ এ খাত থেকে আসে। ফলে তৈরী পোশাক খাতে আন্তর্জাতিক চাহিদার পরিবর্তন, শুল্কবৃদ্ধি কিংবা ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। 
তথ্যানুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে শীর্ষ ১০টি তৈরী পোশাক পণ্যের সম্মিলিত অবদান ছিল মোট রফতানির ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়ায়। সামান্য এই পরিবর্তন রফতানি বৈচিত্র্য অর্জনের েেত্র অগ্রগতির সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে। 
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবাসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে রফতানি প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা, সহজ ঋণ, দ জনশক্তি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক মান সনদ অর্জনের সুযোগ। 
নগদ প্রণোদনা ও ভর্তুকি কমলে বাড়বে চাপ 
এলডিসি উত্তরণের পর রফতানি খাতে সরাসরি নগদ সহায়তা ও কিছু ধরনের ভর্তুকি অব্যাহত রাখার েেত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধির সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। ফলে রফতানিকারকদের জন্য বিদ্যমান প্রণোদনা কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দেবে। 
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকার এরই মধ্যে রফতানি খাতে নগদ সহায়তার হার কমিয়েছে। তবে এ ধরনের সহায়তা কমানোর সাথে সাথে বিকল্প প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে না উঠলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রফতানিকারকরা বেশি চাপে পড়তে পারেন।
তাই সরাসরি নগদ প্রণোদনার পরিবর্তে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি আধুনিকায়ন, স্বল্পসুদে অর্থায়ন, দতা উন্নয়ন, বন্দরসেবা উন্নত করা এবং রফতানি প্রক্রিয়া সহজ করার মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এতে এক দিকে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে চলা সহজ হবে, অন্য দিকে শিল্পের প্রকৃত সমতাও বাড়বে। 
ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্বের নতুন বাস্তবতা 
বাংলাদেশের ওষুধশিল্প এলডিসি-সংশ্লিষ্ট কিছু মেধাস্বত্ব সুবিধা কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম খরচে ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহের সমতা অর্জন করেছে। বিশেষ করে পেটেন্ট সুরার েেত্র বিদ্যমান ছাড়ের কারণে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের সুযোগ পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। 
তবে উত্তরণের পর মেধাস্বত্বসংক্রান্ত সুবিধা কমে গেলে নতুন পেটেন্টযুক্ত ওষুধ ও জীবপ্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের েেত্র উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব ওষুধের দাম, স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা এবং নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের সমতায় পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ওষুধশিল্পকে গবেষণা ও উন্নয়ন, বায়োটেকনোলজি, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ ও উচ্চমূল্যের ওষুধ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সাথে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের আওতায় বাংলাদেশ কী কী সুবিধা পেতে পারে, সে বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। 
রাজস্ব ঘাটতি ও বৈদেশিক ঋণের চাপ 
বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আহরণের নিম্ন হার। রাজস্ব আহরণ কাক্সিক্ষত পর্যায়ে না পৌঁছালে অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরা, শিা, স্বাস্থ্য ও শিল্পে সহায়তা দেয়ার জন্য সরকারের আর্থিক সমতা সীমিত হয়ে পড়ে। 
এর পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের হার জিডিপির ০ দশমিক ৯ শতাংশ থাকলেও ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়ায়। প্রত্য বিদেশী বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করতে পারে। 
এ অবস্থায় কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, সরকারি ব্যয়ের দতা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের েেত্র প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা ও ঋণ পরিশোধের সমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। 
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার দ্বৈত চাপ
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল এমন একসময়ে শেষ হচ্ছে, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘœ জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাবে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। 
অভ্যন্তরীণ েেত্রও ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তন-পরবর্তী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নীতিনির্ধারকদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব এবং ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক দায়। 
এই বহুমুখী চাপের মধ্যে সরকার জাতিসঙ্ঘের কাছে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সময় বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করা জরুরি। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার পিছিয়ে গেলে অতিরিক্ত সময়ও প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনবে না। 
উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতিতে তিন বছরের রোডম্যাপ 
এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশ স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) এবং জাতীয় ট্যারিফ নীতি ২০২৩ বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সাথে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা ধরে রাখা এবং নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। 
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও জাপানের মতো বাজারে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত সুবিধা বা একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সুবিধা ধরে রাখতে শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরা, সুশাসন এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। 
সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৬-০২৯ মেয়াদের রোডম্যাপে তিনটি পর্যায়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। 
প্রথম পর্যায় : তাৎণিক স্থিতিশীলতা ও প্রস্তুতি। ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা এবং পরিবেশ, শ্রম অধিকার ও সুশাসনসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। 
দ্বিতীয় পর্যায় : মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার। ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমে স্বয়ংক্রিয়তা বাড়ানো, রাজস্ব আহরণ জোরদার, শিল্প অবকাঠামো উন্নয়ন, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো কার্যকর করা এবং জাতীয় লজিস্টিকস নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যবসার ব্যয় কমানোর ল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 
তৃতীয় পর্যায় : শিল্পের সমতা বৃদ্ধি। ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত সরাসরি নগদ সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিল্পের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি গ্রহণ, শ্রমিকদের দতা উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। 
এ ছাড়া জাপান, দণি কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সম্পাদনের আলোচনা জোরদার করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এসব চুক্তি বাস্তবায়িত হলে নতুন বাজারে প্রবেশ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রফতানি বহুমুখীকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে চুক্তির শর্ত নির্ধারণের সময় দেশীয় শিল্পের স্বার্থ, রাজস্ব আয় ও স্থানীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতার সমতা বিবেচনায় রাখা জরুরি। 
সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া উত্তরণ টেকসই হবে না 
এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া তদারকির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ নেতৃত্বে একটি জাতীয় সমন্বয় ও পরিবীণ কমিটি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অধীনে গ্র্যাজুয়েশন ডেলিভারি ইউনিট গঠনের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, জবাবদিহি, অগ্রগতি পরিমাপ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন। 
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, রফতানিকারক, শ্রমিক সংগঠন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত বাস্তবায়ন ও সংস্কারের সুফল পরিমাপের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। 
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। কিন্তু এই অর্জনকে টেকসই করতে হলে কম মজুরি ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধার ওপর নির্ভরশীল প্রবৃদ্ধির মডেল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য বাড়াতে হবে উৎপাদনশীলতা, পণ্যের মান, প্রযুক্তির ব্যবহার ও দ জনশক্তির সমতা। 
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নÑ বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রস্তুত? উত্তরণ-পরবর্তী সময়কে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে; অন্যথায় শুল্কসুবিধা হারানো, রফতানি আয় কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার মতো ঝুঁকি উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ, বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সংস্কার এবং শিল্পের প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে এখনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের টেকসই উত্তরণের চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে এই সমন্বিত ও সময়োপযোগী সংস্কারের মধ্যেই।