ব্যাংক খাতের আর্থিক স্বাস্থ্য এখন গভীর চাপের মুখে

- আওয়ামী লীগ আমলের লুুক্কায়িত ঋণ এখন ভয়ঙ্কররূপে বের হচ্ছে, খেলাপি হিসেবে বাড়ছে মূলধন ঘাটতি
- সক্ষমতা কমে যাচ্ছে আমানত পরিশোধের

Advertisement

আশরাফুল ইসলাম

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাত থেকে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসার নজরুল ইসলাম মজুমদারের মতো কিছু অলিগার্ক শ্রেণী গড়ে উঠেছিল। কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাংকগুলো থেকে পানির মতো টাকা বের করে নিয়েছে। কিন্তু ওই সব অর্থ আর ফেরত দেয়া হয়নি। আবার এসব ঋণের তথ্য প্রকাশ করা হতো না, বিশেষ ব্যবস্থায় লুকিয়ে রাখা হতো। ওই সব লুক্কায়িত ঋণ এখন ব্যাংকিং খাতে বের হয়ে আসছে খেলাপি হিসেবে। এতে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের আর্থিক স্বাস্থ্য এখন গভীর চাপের মুখে। খেলাপি ঋণের বিপুল পরিমাণ, মূলধনের ঘাটতি এবং ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরণে ব্যর্থতা একসাথে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সমতাকে দুর্বল করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণ। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যাংকের মুনাফা নয়, আমানতকারীদের আস্থা ও সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। 
বাংলাদেশ ব্যংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংক খাতের সঙ্কট সব প্রতিষ্ঠানে সমান নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুন শেষে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছে খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি কেন্দ্রীভূত। এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এই ১০ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের সম্মিলিত পরিমাণ চার লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। 
ব্যাংকভিত্তিক অনুপাত বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ২০২৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখলে নেয় চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী (বর্তমানে পলাতক) এস আলম গ্রুপ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের বিভিন্ন সময় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংক থেকে এক লাখ কোটি টাকার ওপরে ঋণের নামে বের করে নেয় ব্যাংক ডাকাত খ্যাত এস আলম। ২০২৪ সালের আগস্টের আগেই দেশের নাগরিকত্ব বাতিল করে বিদেশে পাড়ি জমায়। পরবর্তীতে ব্যাংকের কোনো টাকাই পরিশোধ করছেন না। ফলে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে যায়। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৭৫ শতাংশ। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে এই হার প্রায় ৯৭ শতাংশ; ইউনিয়ন ব্যাংকে ৯৬ শতাংশের কাছাকাছি। এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ৩৮ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশ। আইএফআইসি ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকেও খেলাপি ঋণের অনুপাত যথাক্রমে ৬৩ ও ৬৫ শতাংশের বেশি। এসব পরিসংখ্যান দেখায়, কয়েকটি ব্যাংকের ঋণপোর্টফোলিওতে ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। এসব ঋণ আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে বের করে নেয়া হয়। এসব ব্যাংক ডাকাতদের বেশির ভাগই দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তবে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কিছু ব্যাংক থেকে তথাকথিত অলিগার্করা টাকা বের করতে পারেনি। ফলে ওই সব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। এতে ওই সব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে দুর্বল ব্যাংকগুলো আরো তলানিতে নেমে যাচ্ছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিপুল খেলাপি ঋণ এবং পারস্পরিক আর্থিক লেনদেনের কারণে পুরো ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
ব্যাংকের মূলধন সম্ভাব্য ঋণতি মোকাবেলার প্রধান আর্থিক সুরা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ব্যাংক খাতের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত বা সিআরএআর ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে খাতের নিট মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের জুন ২০২৬-এর মূল্যায়নেও ব্যাংক খাতের দুর্বল মূলধন অবস্থার বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রভিশন ঘাটতিও সঙ্কটের আরেকটি বড় সূচক। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় দুই লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংরণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে ঋণতি ব্যাংকের আয় ও মূলধনকে আরো দুর্বল করতে পারে। ফলে দুর্বল ব্যাংকের নতুন ঋণ দেয়ার সমতা কমে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার েেত্র চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। 
এদিকে, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকÑ ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংকÑ একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন ব্যাংকটির মূলধন শক্তিশালী করতে ২০ হাজার কোটি টাকা দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পদের মান যাচাই, পরিচালনা কাঠামো পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে একীভূতকরণ একাই সঙ্কটের সমাধান নয়। পুরনো ঋণগুলোর প্রকৃত আদায়যোগ্যতা নির্ধারণ, অনিয়মের তদন্ত, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের জবাবদিহি এবং বাস্তবসম্মত ঋণ আদায় পরিকল্পনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নতুন ব্যাংকের মূলধন বাড়লেও যদি পুরনো ঋণ থেকে অর্থ উদ্ধার না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আবারো আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
আমানতকারীদের সুরায় ২০২৬ সালের আমানত সুরা আইন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। নতুন আইনে সুরার সীমা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক ব্যর্থ হলে যোগ্য আমানতকারীরা নির্ধারিত সীমার মধ্যে সুরা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে এই সীমার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক আমানতকারী তার সম্পূর্ণ জমা অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত পাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, সম্পদের মান যাচাই, ঋণ শ্রেণীকরণ এবং প্রভিশন সংরণের নিয়ম কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তাও আমানত সুরা, ব্যাংক পুনর্গঠন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সমতা বাড়ানোর ল্েয নেয়া হয়েছে।
জুন ২০২৬-এর তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সঙ্কট মূলত খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল সুশাসনের সম্মিলিত ফল। কয়েকটি ব্যাংক অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে থাকলেও সব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এক নয়। সঙ্কট কাটাতে খেলাপি ঋণ আদায়, প্রভিশন ঘাটতি পূরণ, মূলধন পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের সুরা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে ঋণ অনিয়মের দায় নির্ধারণ ও ব্যাংকভিত্তিক আর্থিক তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন শুধু কোন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কত, তা নয়; বরং ব্যাংকগুলো কতটা তি সামলাতে পারবে এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে।