আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প নিয়ে ভারতে তুমুল বিতর্ক, খবর নেই বাংলাদেশে

রাশিদুল ইসলাম

Advertisement

৮৭ বিলিয়ন ডলারের মেগা আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পকে ভারতের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকরা  ‘প্রকৌশলগত সাফল্য ও কৃষি নিরাপত্তার প্রতীক’ হিসেবে দেখতে চাইলেও, খোদ দেশটির স্বাধীন নদী গবেষক, পরিবেশবিদ ও তিগ্রস্ত স্থানীয় জনগণ একে ‘পরিবেশগত আত্মঘাতী, বৈজ্ঞানিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও অমানবিক মেগা প্রকল্প’ হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নিয়েছে। বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ, সেমিনার ও নদী রক্ষায় বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর আন্দোলন, গ্রামবাসীদের বাস্তুচ্যুতি, পৈতৃক জমি হারানো এবং জীবিকা বিঘিœত হওয়ায় অনেকেই নিজেদের বসতভিটা রায় প্রতিবাদ ও সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছেন। এমনকি ২০০৩ সালে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও ভারতে যৌথ আন্দোলন শুরু হলেও তা দুই দেশের শাসক সুকৌশলে দমিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। তারপরও পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিন্ন নদীর বাস্তুতন্ত্রে পরিবর্তন, বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস এবং হাজার হাজার গ্রামীণ ও আদিবাসী পরিবারের বাস্তুচ্যুতি সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন।  যেভাবে আন্দোলন দমানো হয়েছে
আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির বাংলাদেশ সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি ও গ্রিনওয়াচ পত্রিকার সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার তার দুই দশকের বেশি সময়ের নদী রক্ষা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে নয়া দিগন্তকে বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রতিবেশী দেশ যা বলত তাই হতো, আন্দোলনের কোনো মানে ছিল না; কিন্তু ২০০৩ সালে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও ভারতে যৌথভাবেই আন্দোলন হয়েছে। এরপর ‘পাওয়ার স্ট্রাকচার চেঞ্জ’ বা ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনে আর পালাবদলে নদী রক্ষার আন্দোলন স্তিমিত হয়েছে। জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামল বাদ দিলে পুরো সময়টা ভারতের অধীনস্থ হিসেবে বিবেচিত ছিলাম। এমনকি আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির কোনো সেমিনার করতে হলরুম বুকিং নিলে তা বাতিল করে দেয়া হতো। বলা হতো ভারতীয় দূতাবাসের আপত্তি আছে। ফলে নদী রক্ষার আন্দোলন দুর্বল হয়ে দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠান বা বিবৃতিতে পরিণত হয়।  দুই দেশের যৌথ আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বলেন, ভারতের নদী বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন সংগঠন ও অ্যাক্টিভিস্টদের যাতে যোগাযোগ ছিল; কিন্তু দুই দেশের রাজনৈকি পটপরিবর্তনে এ যোগাযোগ শিথিল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে এখনো সীমিত আকারে কথা হচ্ছে। একসময় তারা মনে করত দিল্লিতে নদী রক্ষার আন্দোলনের সাথে ঢাকা সোচ্চার হলে তাদের আন্দোলনটাও বেগবান হয়। এমন একটা বোঝাপড়া ছিল; কিন্তু নদী রক্ষা আন্দোলন নিয়ে সভা-সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধ চলে আসায় তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। 
নদী রক্ষার আন্দোলনে সহায়ক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, পদ্মা ব্যারেজ বলেন আর তিস্তা চুক্তি বলেন এসব হলেই পানি আসবে না। ৫৪টি অভিন্ন নদীতে পানিপ্রবাহ সঠিকভাবে না এলে নদীমাতৃক বা নদী সৃষ্ট বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকবে না। এ নিয়ে ভারতের কোনো রেসপন্স পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যারেজ ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে পানি অটোমেটিক চলে আসবে না। বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণে জোরদার আন্দোলন ছাড়া সেটি হবে না। পানি ও পরিবেশ সম্পর্কিত বিশ্বে যত আইন ও কনভেনশন তার সবগুলোই বলছে অভিন্ন নদীগুলোর পানিপ্রবাহ বাংলাদেশের প্রাপ্য। নদী-সাগর পর্যন্ত জীবিত থাকতে হবে; কিন্তু বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত শক্তির বলে ইচ্ছেমতো যা কিছু করছে এবং সেটি যে পরিবেশসম্মত না সে কারণেই দেশটির পরিবেশবাদীরা আন্দোলন করছে। দেশে আমরাও রাজনৈতিকদলগুলোর সাথে বসব, পরামর্শ নেব কিভাবে নদী রক্ষায় বড় আন্দোলন গড়ে তোলা যায়।    
নদী রক্ষায় বিলাসী কর্মসূচি!
ষোল বছর ধরে নদী রক্ষার আন্দোলনে সম্পৃক্ত আছেন তুহিন ওয়াদুদ। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে ঘুরে ফিরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ডিন ও  এই অধ্যাপক দেখেছেন ফারাক্কার প্রভাবে আর উজান দেশের পানি প্রত্যাহারে কিভাবে ভাটির দেশে একের পর এক নদী মারা যাচ্ছে, ভরাট হচ্ছে এবং স্বার্থান্বেষী মহল ও প্রশাসনের যোগসাজশে মরা নদী ভরাট করে নদীখেকোরা তা গিলে খাচ্ছে। নদী ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠক, গবেষক ও লেখক তুহিন ওয়াদুদ স্বীকার করেন, গত কুড়ি বছরে রাজনৈতিক কারণেই নদী রক্ষায় জোরালো কোনো আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না। আক্ষেপ করে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, নদী রক্ষার নামে যেসব সভা-সমাবেশ, সেমিনার কর্মসূচি দেখেন এগুলো বিলাসী। সচেতনতা সৃষ্টি করতে নদীর পাড়ে পাড়ে বাসিন্দাদের তৈরি করতে হবে। ঢাকায় বা বিভিন্ন শহরে নিরাপদে আন্দোলন করে সরকারের সাথে মিলেমিশে থাকায় নদী রক্ষায় কোনো পথ তৈরি হবে না। আন্দোলনের পথ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা, ক্ষমতার মধ্যে বসে থাকা নয়। বিগত কুড়ি বছরে ক্ষমতার বাইরে নদী রক্ষার আন্দোলনে গেলেই তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ট্যাগ বা লেবেল সেঁটে দিয়ে দমন করার পর মানুষ আর নিজে থেকে আন্দোলনে যেতে চায় না। 
নদীপাড়ের বাসিন্দাদের সাথে কথোপকথনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, আন্দোলন করেন না কেনÑ এ প্রশ্নের উত্তরে তারা বলে এলাকার রাজনীতিবিদ প্রভাবশালী লোকজন, পুলিশ ও প্রশাসন একসাথে মিলে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, এরাই নদী ধ্বংসকারী এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত তাদের দৌরাত্ম্য। চোখের সামনে নদী মরে যাচ্ছে দেখেও মানুষ ইউএনওকে বলে না, মানববন্ধন করে না, নদী ভরটাকারীদেরও কিছু বলে না। মাঠপর্যায়ের নদী সচেতনতা এটাই। এই একজোট ভাঙতে না পারলে নদী বাঁচানো যাবে না। 
তুহিন ওয়াদুদ বলেন, তারপরও কিছু মানুষ ঝুঁকি নিয়ে নদী রক্ষার আন্দোলন করছে। নদী রক্ষায় লক্ষ্য স্থির করে গণমাধ্যম ভূমিকা রাখলে এটা বাড়ত। মাঠপর্যায়ে যারা নদীসঙ্কট নিয়ে কাজ করে মিডিয়া তা সামনে আনতে পারে। ভারতের সাথে নদী রক্ষায় যৌথ আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতীয়দের সাথে যোগাযোগ নেই তা না, যৌথভাবে সভা-সেমিনার করি; কিন্তু মুশকিল হচ্ছে শেষ পর্যন্ত আমাদের ক্ষতি হলেও ওরা অন্ধের মতো থাকে, ওদের দেশাত্মবোধটা আঞ্চলিক পর্যায়ের। খুব স্থানিক ও ঘটনাকেন্দ্রিক। নদী উদ্ধারের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, যারা নদী নিয়ে কাজ করছেন তাদের অর্জন আয়নায় দেখা উচিত। মানুষ তার নদী রক্ষায় এগিয়ে আসছে কি না পরিবেশ আন্দোলনকারীদের তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।       
ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প কেনো বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিনাশী
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদীর ‘অতিরিক্ত’ বা ‘উদ্বৃত্ত’ পানি খালের মাধ্যমে পানিসম্পদ-ঘাটতিযুক্ত অঞ্চলে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন চলছে। ফলে ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও তিস্তার মতো প্রধান আন্তর্জাতিক নদীর উজানে বড় আকারে পানি অপসারণ বা ঘুরিয়ে নিলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। বাংলাদেশের উত্তর ও দণি-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিকাজ সম্পূর্ণভাবে নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। পানির তীব্র ঘাটতির কারণে সেচ কার্যক্রম থমকে যাবে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে। পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীগুলো শুকিয়ে পলি জমে ভরাট হচ্ছে, যা দেশের একটি বড় অংশকে মরুকরণের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। উজানে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সমুদ্রের জোয়ারের লোনাপানি দেশের অভ্যন্তরে অনেকদূর পর্যন্ত উঠে এসেছে। সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে ও ভূগর্ভের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। মিষ্টি পানির উৎসের অভাবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ফসল উৎপাদন ও সুপেয় পানির সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। 
এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে ভারত বিভিন্ন স্থানে বাঁধ, জলাধার ও সংযোগ খাল নির্মাণ করছে, যা বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় বা জলাধারগুলোর ধারণমতা পূর্ণ হয়ে গেলে ভারত হঠাৎ করে একসাথে বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দিলে তা বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে আকস্মিক ও মারাত্মক বন্যা সৃষ্টি করছে। এই ধরনের আকস্মিক বন্যা প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষকে গৃহহীন করে তুলছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ব্যাপক তিসাধন হওয়ায় শহরে কাজের খোঁজে মানুষের চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশের নদ-নদী ও হাওর-বাঁওড় মিঠা পানির মাছের এক বিশাল ভাণ্ডার হওয়ায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পলিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় মাছের প্রজনন এবং বিচরণ ত্রে নষ্ট হচ্ছে এবং মাছের সঙ্কট তীব্র হচ্ছে, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আমিষের চাহিদা পূরণ ও জেলেদের জীবনজীবিকাকে বিপন্ন করে তুলেছে। নদ-নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় চার পাশের ভূগর্ভের পানির স্তর আর প্রাকৃতিকভাবে পুনর্ভরিত হতে পারছে না। ফলে নলকূপগুলো কার্যকারিতা হারাচ্ছে এবং সুপেয় পানির অভাব দেখা দিয়েছে। 
আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প কতদূর এগিয়েছে
ভারতীয় মিডিয়া প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই মেগা প্রকল্পের ৫% থেকে ১০% বর্তমানে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের মুখ দেখেছে। মোট ৩০টি আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প (১৬টি উপদ্বীপীয় বা পেনিনসুলার এবং ১৪টি হিমালয়ভিত্তিক) চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কেন-বেতোয়া লিংক প্রজেক্ট বর্তমানে নির্মাণের পর্যায়ে রয়েছে। এর জন্য ২০২০-২১ সালের মূল্যস্তর অনুযায়ী মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪ হাজার ৬০৫ কোটি রুপি (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকার বেশি)। এ পর্যন্ত (চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত) মোট প্রায় ১২ হাজার ৩৮২ কোটি রুপি ব্যয় করা হয়েছে। এই মোট ব্যয়ের প্রায় ৯০% বা ৩৯ হাজার ৩১৭ কোটি রুপি সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকার অনুদান বা সহায়তা হিসেবে দিচ্ছে এবং বাকি অংশ সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলো (মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশ) বহন করছে। মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশ সংলগ্ন বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে পানি সঙ্কট দূর করার জন্য প্রকল্পটিকে ভারতের প্রথম অগ্রাধিকারভিত্তিক লিংক প্রকল্প হিসেবে ধরা হয়। মূল নির্মাণকাজ (দওহান বাঁধ ও সংযোগ খালের কাজ) পুরোদমে এগিয়ে চলছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। এ ছাড়া পার-তাপি-নরমদা এবং দামানগঙ্গা-পিঞ্জাল) প্রকল্পের বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরির পর রাজ্যগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ ও তীব্র জনমতের কারণে সেগুলোকে আপাতত অগ্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। হিমালয় অঞ্চলের বড় বড় অববাহিকা সংযোগ প্রকল্পগুলো (যেমনÑ ব্রহ্মপুত্র বা গঙ্গা অববাহিকাভিত্তিক প্রস্তাবগুলো) জটিল আন্তর্জাতিক ও প্রতিবেশগত মাত্রার কারণে মূলত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের স্তরে সীমাবদ্ধ রয়েছে।